পরিষদের লোগোজমিরিয়া তা'লিম ও তায্‌কিয়া পরিষদ বাংলাদেশঘরে ঘরে আলেম ও মুত্তাকী বান্দা, উন্নত হোক দেশের শিক্ষা

চাঁদা, সদাকা ও যাকাতের তহবিল আলাদা রাখার নিয়ম

৬ নভেম্বর ২০২৬ · ৬ মিনিটে পড়া · জমিরিয়া তা'লিম ও তায্‌কিয়া পরিষদ

মাদরাসায় চাঁদা, সদাকা ও যাকাতের টাকা আলাদা আলাদা তহবিলে রাখা উচিত, কারণ প্রতিটির ব্যয়ের খাত ও শর্ত এক নয়। দাতা যে উদ্দেশ্যে দিয়েছেন, ঠিক সেই উদ্দেশ্যেই খরচ করা আমানতের দাবি। কোন তহবিল কোন খাতে ব্যয় করা যায়, সেই শরয়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছ থেকে; এই লেখায় বলা হয়েছে হিসাব রাখার ব্যবহারিক দিক।

তহবিল আলাদা রাখা কেন জরুরি?

দাতা টাকা দেন নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে। একটি তহবিলের টাকা অন্য খাতে মিশে গেলে হিসাব অস্পষ্ট হয় এবং দায়িত্বশীলরা শরয়ী ও নৈতিক দায়ে পড়তে পারেন। আলাদা রাখলে প্রতিটি টাকার হদিস স্পষ্ট থাকে, অডিট সহজ হয় এবং দাতারা নিশ্চিন্ত হন।

তহবিলগুলোর সাধারণ ধরন কী?

মাদরাসায় সাধারণত এই ধরনের অর্থ আসে:

  • সাধারণ চাঁদা: মাদরাসার সাধারণ খরচের জন্য।
  • সদাকা ও নফল দান: দাতার ইচ্ছা ও মাদরাসার নীতি অনুযায়ী ব্যয়।
  • যাকাত ও ফিতরা: এগুলো নির্দিষ্ট খাতে ও নির্দিষ্ট শর্তে ব্যয় হয়।
  • নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের দান: যেমন ভবন নির্মাণ, ইয়াতিম ছাত্রদের খরচ বা কিতাব ক্রয়।
  • ছাত্রের মাসিক ফি বা খাবারের টাকা: অভিভাবকের দেওয়া নির্ধারিত অর্থ।

কোন তহবিলের টাকা কোন কাজে লাগে, বিশেষ করে যাকাত ও সদাকার ক্ষেত্রে, সে বিষয়ে একজন নির্ভরযোগ্য মুফতির লিখিত বা মৌখিক ফতোয়া নিয়ে রেখে দিন। মাসআলা নিজে অনুমান করে ঠিক করবেন না।

কীভাবে আলাদা রাখবেন?

বাস্তবে কয়েকটি স্তরে আলাদা রাখা যায়:

  • আলাদা খাতা বা আলাদা পাতা: প্রতিটি তহবিলের আয়-ব্যয় ও জের আলাদা লিখুন।
  • আলাদা রসিদ বই বা রসিদে খাতের উল্লেখ: রসিদে স্পষ্ট লিখুন "যাকাত", "সদাকা", "সাধারণ চাঁদা"।
  • আলাদা ব্যাংক হিসাব বা অন্তত আলাদা হিসাবের শিরোনাম: সম্ভব হলে টাকাও আলাদা রাখুন।
  • আলাদা বাক্স বা খাম: নগদ টাকা হাতে থাকলে চিহ্নিত করে রাখুন।

এক তহবিল থেকে আরেক তহবিলে টাকা নেওয়া যায় কি?

এটি শরয়ী ও আমানতের প্রশ্ন, তাই নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে মুফতির কাছে জানতে হবে। কখনো জরুরি প্রয়োজনে ধার নেওয়ার কথা উঠলে কমিটির লিখিত অনুমোদন, মুফতির পরামর্শ এবং ফেরত দেওয়ার সময়সূচি লিখে রাখা নিরাপদ নিয়ম। অনুমতি ও রেকর্ড ছাড়া মিশিয়ে ফেলা এড়িয়ে চলুন।

হিসাবে কী কী লিখবেন?

প্রতিটি তহবিলের জন্য মাসিক ও বার্ষিক সারাংশে এই তথ্যগুলো রাখুন:

  • শুরুর জের।
  • ওই মাসে প্রাপ্ত অর্থ (দাতার নাম গোপন রাখার ইচ্ছা থাকলে সম্মান করে)।
  • কোন কোন খাতে কত ব্যয়।
  • শেষ জের।

খরচের বিপরীতে ভাউচার বা প্রাপকের স্বীকৃতি সংরক্ষণ করুন। হিসাব রাখার সাধারণ পদ্ধতি দেখুন হিসাবের খাতা: আয়-ব্যয়, রসিদ ও ভাউচার লেখায়।

দাতাদের কীভাবে জানাবেন?

বছরে অন্তত একবার তহবিলভেদে সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন দেওয়া ভালো। কত এলো, কোথায় গেল এবং কত জমা আছে, সহজ ভাষায় জানান। এতে আস্থা বাড়ে। বিস্তারিত পদ্ধতি পাবেন দাতাদের কাছে স্বচ্ছ প্রতিবেদন লেখায়। ইয়াতিম ও গরিব ছাত্রদের জন্য ব্যবস্থার বিষয়ে পড়তে পারেন ইয়াতিম ও গরিব ছাত্রদের দায়িত্ব।

অডিটে এটি কীভাবে দেখা হয়?

অডিটকারী দেখেন তহবিলভিত্তিক জের ঠিক আছে কি না, রসিদে খাত উল্লেখ আছে কি না, এবং ব্যয়ের কাগজ আছে কি না। মাসিক অডিটের চেকলিস্টে তহবিল পরীক্ষা একটি আলাদা ধাপ।

কুরআন ও হাদীসের আলোকে

এই বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের একটি করে নির্দেশনা দেখা যায়।

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيْنٍ إِلَىٰٓ أَجَلٍۢ مُّسَمًّۭى فَٱكْتُبُوهُ ۚ وَلْيَكْتُب بَّيْنَكُمْ كَاتِبٌۢ بِٱلْعَدْلِ ۚ وَلَا يَأْبَ كَاتِبٌ أَن يَكْتُبَ كَمَا عَلَّمَهُ ٱللَّهُ ۚ فَلْيَكْتُبْ وَلْيُمْلِلِ ٱلَّذِى عَلَيْهِ ٱلْحَقُّ وَلْيَتَّقِ ٱللَّهَ رَبَّهُۥ وَلَا يَبْخَسْ مِنْهُ شَيْـًۭٔا ۚ فَإِن كَانَ ٱلَّذِى عَلَيْهِ ٱلْحَقُّ سَفِيهًا أَوْ ضَعِيفًا أَوْ لَا يَسْتَطِيعُ أَن يُمِلَّ هُوَ فَلْيُمْلِلْ وَلِيُّهُۥ بِٱلْعَدْلِ ۚ وَٱسْتَشْهِدُوا۟ شَهِيدَيْنِ مِن رِّجَالِكُمْ ۖ فَإِن لَّمْ يَكُونَا رَجُلَيْنِ فَرَجُلٌۭ وَٱمْرَأَتَانِ مِمَّن تَرْضَوْنَ مِنَ ٱلشُّهَدَآءِ أَن تَضِلَّ إِحْدَىٰهُمَا فَتُذَكِّرَ إِحْدَىٰهُمَا ٱلْأُخْرَىٰ ۚ وَلَا يَأْبَ ٱلشُّهَدَآءُ إِذَا مَا دُعُوا۟ ۚ وَلَا تَسْـَٔمُوٓا۟ أَن تَكْتُبُوهُ صَغِيرًا أَوْ كَبِيرًا إِلَىٰٓ أَجَلِهِۦ ۚ ذَٰلِكُمْ أَقْسَطُ عِندَ ٱللَّهِ وَأَقْوَمُ لِلشَّهَٰدَةِ وَأَدْنَىٰٓ أَلَّا تَرْتَابُوٓا۟ ۖ إِلَّآ أَن تَكُونَ تِجَٰرَةً حَاضِرَةًۭ تُدِيرُونَهَا بَيْنَكُمْ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَلَّا تَكْتُبُوهَا ۗ وَأَشْهِدُوٓا۟ إِذَا تَبَايَعْتُمْ ۚ وَلَا يُضَآرَّ كَاتِبٌۭ وَلَا شَهِيدٌۭ ۚ وَإِن تَفْعَلُوا۟ فَإِنَّهُۥ فُسُوقٌۢ بِكُمْ ۗ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۖ وَيُعَلِّمُكُمُ ٱللَّهُ ۗ وَٱللَّهُ بِكُلِّ شَىْءٍ عَلِيمٌۭ

হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ঋনের আদান-প্রদান কর, তখন তা লিপিবদ্ধ করে নাও এবং তোমাদের মধ্যে কোন লেখক ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লিখে দেবে; লেখক লিখতে অস্বীকার করবে না। আল্লাহ তাকে যেমন শিক্ষা দিয়েছেন, তার উচিত তা লিখে দেয়া। এবং ঋন গ্রহীতা যেন লেখার বিষয় বলে দেয় এবং সে যেন স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্রও বেশ কম না করে। অতঃপর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দূর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বলে দিতে অক্ষম হয়, তবে তার অভিভাবক ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখাবে। দুজন সাক্ষী কর, তোমাদের পুরুষদের মধ্যে থেকে। যদি দুজন পুরুষ না হয়, তবে একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা। ঐ সাক্ষীদের মধ্য থেকে যাদেরকে তোমরা পছন্দ কর যাতে একজন যদি ভুলে যায়, তবে একজন অন্যজনকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যখন ডাকা হয়, তখন সাক্ষীদের অস্বীকার করা উচিত নয়। তোমরা এটা লিখতে অলসতা করোনা, তা ছোট হোক কিংবা বড়, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এ লিপিবদ্ধ করণ আল্লাহর কাছে সুবিচারকে অধিক কায়েম রাখে, সাক্ষ্যকে অধিক সুসংহত রাখে এবং তোমাদের সন্দেহে পতিত না হওয়ার পক্ষে অধিক উপযুক্ত। কিন্তু যদি কারবার নগদ হয়, পরস্পর হাতে হাতে আদান-প্রদান কর, তবে তা না লিখলে তোমাদের প্রতি কোন অভিযোগ নেই। তোমরা ক্রয়-বিক্রয়ের সময় সাক্ষী রাখ। কোন লেখক ও সাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করো না। যদি তোমরা এরূপ কর, তবে তা তোমাদের পক্ষে পাপের বিষয়। আল্লাহকে ভয় কর তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আল্লাহ সব কিছু জানেন।

সূরা বাকারা, আয়াত ২:২৮২

লেনদেন লিখে রাখার এই নির্দেশ হিসাব-নিকাশের স্বচ্ছতার মূল ভিত্তি। আয়-ব্যয়ের খাতা, রসিদ ও ভাউচার রাখা এই শিক্ষারই বাস্তব রূপ।

عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَصْدُقُ وَيَتَحَرَّى الصِّدْقَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ صِدِّيقًا وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ كَذَّابًا

ভাবার্থ: তোমরা সত্যকে আঁকড়ে ধরো; সত্য নেকীর পথ দেখায়, আর নেকী জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।

সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬০৭

সত্যবাদিতা হিসাবেও জরুরি। যা আয় হয়েছে ও যা ব্যয় হয়েছে তা যেমন তেমন লেখা এবং কোনো কিছু গোপন না করাই আমানতদারি।

সংক্ষেপে করণীয়

  • প্রতিটি তহবিলের আলাদা হিসাব ও আলাদা জের রাখুন।
  • রসিদে খাত পরিষ্কারভাবে লিখুন।
  • ব্যয়ের শরয়ী খাত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য মুফতির ফতোয়া নিন ও সংরক্ষণ করুন।
  • তহবিল মেশানো এড়িয়ে চলুন; একান্ত প্রয়োজন হলে লিখিত অনুমোদন ও পরামর্শ নিন।
  • মাসিক ও বার্ষিক সারাংশে তহবিলভেদে জের দেখান।
  • দাতাদের কাছে নিয়মিত সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন দিন।

প্রশ্নোত্তর

যাকাতের টাকা কি মাদরাসার বেতন বা ভবনে খরচ করা যায়?

এটি একটি ফিকহী বিষয়, যার উত্তর খাত ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। তাই নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে সরাসরি জিজ্ঞেস করে তাঁর ফতোয়া অনুযায়ী চলুন এবং তা রেকর্ডে রাখুন।

দাতা নির্দিষ্ট খাত না বললে টাকা কোথায় রাখব?

দান গ্রহণের সময় জিজ্ঞেস করে নেওয়া সবচেয়ে ভালো। না জানলে সাধারণ চাঁদা হিসেবে রসিদ দিয়ে লিখে রাখুন এবং প্রয়োজনে মুফতির পরামর্শ নিন।

ছোট মাদরাসায় আলাদা ব্যাংক হিসাব না থাকলে কী করব?

অন্তত খাতায় আলাদা হিসাব ও আলাদা জের রাখুন। সম্ভব হলে ধীরে ধীরে আলাদা ব্যাংক বা মোবাইল হিসাব ব্যবহার শুরু করুন।

আলাদা রাখলে কি ঘাটতির সময় সমস্যা হবে?

হিসাব আলাদা থাকলে ঘাটতি কোথায়, তা স্পষ্ট দেখা যায় এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। ঘাটতি পূরণে অনুমতিসাপেক্ষ বিকল্প আলোচনা করুন কমিটি ও মুফতির সাথে।

এই লেখা পরিষদের সম্পাদনা পরিষদের পক্ষ থেকে সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য। ফিকহী বা আইনগত বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

#তহবিল#চাঁদা#সদাকা#যাকাত#হিসাব

আরও পড়ুন

অডিট ও হিসাব

হিসাবের খাতা: আয়-ব্যয়, রসিদ ও ভাউচার

মাদরাসার ক্যাশবই, রসিদ বই ও ভাউচার ফাইল কীভাবে রাখবেন, কী কী লিখবেন এবং কোন ভুলগুলো এড়াবেন, তার সহজ ব্যবহারিক নির্দেশিকা।

৬ মিনিটে পড়া · ৬ নভেম্বর ২০২৬

অডিট ও হিসাব

দাতাদের কাছে স্বচ্ছ প্রতিবেদন

দাতাদের আস্থা ধরে রাখতে মাদরাসা কীভাবে সহজ, সৎ ও নিয়মিত আয়-ব্যয়ের প্রতিবেদন তৈরি করবে, তার কাঠামো এবং করণীয়।

৬ মিনিটে পড়া · ৬ নভেম্বর ২০২৬

অডিট ও হিসাব

মাসিক অডিট: মাদরাসার জন্য চেকলিস্ট

মাসের শেষে মাদরাসার হিসাব মেলানোর ধাপে ধাপে চেকলিস্ট: ক্যাশ, রসিদ, ভাউচার, বেতন ও তহবিল কীভাবে পরীক্ষা করবেন।

৬ মিনিটে পড়া · ৬ নভেম্বর ২০২৬

অভিভাবক ও সমাজ

ইয়াতিম ও গরিব ছাত্রদের দায়িত্ব

ইয়াতিম ও গরিব ছাত্রদের শিক্ষা ও যত্নের দায়িত্ব সমাজ ও মাদরাসা কীভাবে পালন করতে পারে এবং সহায়তায় কী সতর্কতা দরকার।

৬ মিনিটে পড়া · ৬ নভেম্বর ২০২৬