পরিষদের লোগোজমিরিয়া তা'লিম ও তায্‌কিয়া পরিষদ বাংলাদেশঘরে ঘরে আলেম ও মুত্তাকী বান্দা, উন্নত হোক দেশের শিক্ষা

ইফতা কেন: ফাতওয়া বিভাগের প্রয়োজন

৬ নভেম্বর ২০২৬ · ৫ মিনিটে পড়া · জমিরিয়া তা'লিম ও তায্‌কিয়া পরিষদ

ইফতা হলো ফাতওয়া দেওয়ার বিশেষ প্রশিক্ষণ, যা সাধারণত নিসাব শেষ করার পর গভীর অধ্যয়নের মাধ্যমে হয়। সমাজে প্রতিদিন নতুন নতুন প্রশ্ন আসে, তাই এমন যোগ্য ব্যক্তি দরকার যাঁরা দ্বীনের আলোকে সঠিক নির্দেশনা দিতে পারেন। একটি নির্ভরযোগ্য ফাতওয়া বিভাগ সেই প্রয়োজনই পূরণ করে।

এখানে একটি কথা পরিষ্কার করা দরকার। পরিষদের ১৫ বছরের পাঠ্যসূচির তালিকায় আলাদা কোনো "ইফতা" স্তর উল্লেখ নেই। তাই এই লেখায় ইফতার প্রস্তুতির সাধারণ ধারণা দেওয়া হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে নিসাবের কোন বিষয়গুলো সেই যোগ্যতার ভিত তৈরি করে। কোনো ইফতা কোর্স চালু বা ঘোষণা হলে তা পরিষদের নোটিশ পাতা থেকে জানা যাবে।

ইফতা কী এবং মুফতির কাজ কী?

ইফতা মানে ফাতওয়া প্রদানের জ্ঞান ও চর্চা। মুফতি হলেন সেই আলেম যিনি মানুষের জিজ্ঞাসার জবাবে শরীয়তের বিধান জানান। তাঁর উত্তর শুধু মতামত নয়; এর পেছনে দলিল, ফিকহের নীতি ও মানুষের বাস্তব অবস্থা বোঝার দায়িত্ব থাকে।

কোনো বিষয়ের বিধান কেমন, সেটি নির্ধারণ করা এই লেখার কাজ নয়। সেটি যোগ্য মুফতির কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।

সমাজে ফাতওয়া বিভাগের প্রয়োজন কেন?

  • সাধারণ মানুষ জানতে চায়। ইবাদত, পারিবারিক বিষয়, লেনদেন, উত্তরাধিকার ও অন্যান্য জীবনঘনিষ্ঠ প্রশ্নে মানুষ নির্ভরযোগ্য উত্তর খোঁজে।
  • ভুল ব্যাখ্যা এড়ানো। অনির্ভরযোগ্য উৎস থেকে ভুল তথ্য ছড়ায়। প্রশিক্ষিত মুফতি থাকলে মানুষ সঠিক জায়গায় যেতে পারে।
  • ঐক্য ও সামঞ্জস্য। একই ধারার নির্ভরযোগ্য চর্চা থাকলে সমাজে বিভ্রান্তি কমে।
  • নতুন পরিস্থিতির মোকাবিলা। সময়ের সাথে নতুন বিষয় আসে, যেগুলো বুঝতে ফিকহের গভীর জ্ঞান লাগে।

সমাজে আলেমদের ভূমিকা সম্পর্কে আরও জানতে পারেন সমাজে আলেমদের দায়িত্ব লেখায়।

ইফতার আগে কোন কোন ভিত দরকার হয়?

ইফতা কোনো আলাদা জাদুর কোর্স নয়; এর আগে দীর্ঘ প্রস্তুতি লাগে। নিসাবের যেসব বিষয় এই প্রস্তুতিতে ভূমিকা রাখে:

  • আরবি ভাষা: নাহু, সরফ, আরবি সাহিত্য ও বালাগাত, যেগুলো নিসাবের বহু বছর ধরে ধাপে ধাপে আসে।
  • ফিকহ: পাঠ্যসূচিতে ইবতিদাইয়্যাহ স্তরে "তা'লীমুল ইসলাম" ও "বেহেশতী জেওর" থেকে শুরু করে "কুদূরী", "কানযুদ দাক্বাইক্ব", "শরহে বেকায়া" এবং হিদায়া ১ম থেকে ৪র্থ খণ্ড পর্যন্ত আছে।
  • উসূলে ফিকহ: "উসূলুশ শাশী", "নূরুল আনওয়ার", "হুসামী", "তাওযীহ" ও "মুসাল্লামুছ ছুবূত"।
  • ফারায়েজ: ছানাবিয়্যাহ খাসসাহ ১ম বর্ষে বিষয় হিসেবে আছে এবং "সিরাজী" কিতাব আছে।
  • হাদীস ও উসূলে হাদীস: মিশকাত থেকে দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত।
  • আকাইদ: "শরহে আকাইদ" ও "আকীদাতুত ত্বহাবী"।

এই বিষয়গুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাবেন ফিকহ ও উসূলে ফিকহ কেন পড়ানো হয় লেখায়।

কেন শুধু নিসাব শেষ করলেই মুফতি হওয়া যায় না?

নিসাব হলো সাধারণ আলেম গড়ার কাঠামো। ফাতওয়া দেওয়া একটি বিশেষ দায়িত্ব, যেখানে বহু বিষয়ে সূক্ষ্ম বিচার, অভিজ্ঞ মুফতির তত্ত্বাবধানে লেখা ও অনুশীলন এবং বাস্তবতা বোঝার প্রশিক্ষণ লাগে। তাই ঐতিহ্যগতভাবে দাওরার পর আলাদা মেয়াদে নির্দিষ্ট ইফতা বিভাগে পড়াশোনা করা হয়।

আরেকটি জরুরি বিষয় হলো তাকওয়া ও সতর্কতা। ফাতওয়া দেওয়া আমানতের কাজ। যে বিষয়ে জ্ঞান নেই বা নিশ্চিত নন, সেখানে বিরত থাকাই আদব। তাই ইফতার শিক্ষার্থীকে জ্ঞানের পাশাপাশি আখলাক ও তাযকিয়ায় এগোতে হয়।

অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর জন্য এর অর্থ কী?

আপনার সন্তান যদি ভবিষ্যতে ইফতার পথে যেতে চায়, তবে প্রথমে নিসাবের ভিত শক্ত করাই মূল কাজ। এর জন্য দাওরায়ে হাদীস কী ও কেন পড়লে বোঝা যাবে শেষ বছরের ভূমিকা কী। সম্পূর্ণ নিসাবের ছবি দেখতে ১৫ বছরের নিসাব: এক নজরে পড়তে পারেন। কোন কোর্সে কী শর্ত, সে তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন।

কুরআন ও হাদীসের আলোকে

এই বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের একটি করে নির্দেশনা দেখা যায়।

أَمَّنْ هُوَ قَٰنِتٌ ءَانَآءَ ٱلَّيْلِ سَاجِدًۭا وَقَآئِمًۭا يَحْذَرُ ٱلْءَاخِرَةَ وَيَرْجُوا۟ رَحْمَةَ رَبِّهِۦ ۗ قُلْ هَلْ يَسْتَوِى ٱلَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَٱلَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ ۗ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُو۟لُوا۟ ٱلْأَلْبَٰبِ

যে ব্যক্তি রাত্রিকালে সেজদার মাধ্যমে অথবা দাঁড়িয়ে এবাদত করে, পরকালের আশংকা রাখে এবং তার পালনকর্তার রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এরূপ করে না; বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।

সূরা যুমার, আয়াত ৩৯:৯

ইলমের মর্যাদা বোঝাতে এই আয়াত বারবার পড়া হয়। যাঁরা শেখেন ও শেখান, তাঁদের প্রতি সম্মান ও যত্ন মাদরাসার পরিবেশের অংশ হওয়া উচিত।

… مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ إِلاَّ نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلاَئِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ وَمَنْ بَطَّأَ بِهِ عَمَلُهُ لَمْ يُسْرِعْ بِهِ نَسَبُهُ

ভাবার্থ: যে ব্যক্তি ইলম অর্জনের পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।

সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৯৯

ইলম অর্জনের পথকে আল্লাহ জান্নাতের পথ সহজ করে দেন বলে জানানো হয়েছে। শিক্ষক ও তালিবে ইলম উভয়ের জন্য এটি বড় উৎসাহ।

সংক্ষেপে করণীয়

  • ফাতওয়ার জন্য যোগ্য ও নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে যান; অনলাইনের অচেনা উৎসে ভরসা করবেন না।
  • সন্তান ইফতার পথে যেতে চাইলে আরবি ভাষা, ফিকহ ও উসূলের ভিত মজবুত করতে সহায়তা করুন।
  • ইফতা কোর্সের তথ্য কেবল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা পরিষদের নোটিশ থেকে নিন।
  • জ্ঞানের সাথে তাকওয়া ও আদবের চর্চা চালু রাখুন।

প্রশ্নোত্তর

ইফতা কি পরিষদের ১৫ বছরের নিসাবের অংশ?

পাঠ্যসূচির তালিকায় আলাদা ইফতা স্তর উল্লেখ নেই। নিসাবের ফিকহ, উসূল, হাদীস ও আরবির বিষয়গুলো ইফতার ভিত হিসেবে কাজ করতে পারে। নতুন কোনো কোর্স হলে তা নোটিশে জানানো হবে।

আমি কি নিজে বই পড়ে ফাতওয়া দিতে পারব?

না। ফাতওয়া একটি বিশেষ যোগ্যতা ও দায়িত্বের কাজ। বই পড়ে নিজে সিদ্ধান্ত না দিয়ে যোগ্য মুফতির কাছে জিজ্ঞেস করুন।

মুফতির কাছে প্রশ্ন করার সময় কী খেয়াল রাখব?

পরিস্থিতি পরিষ্কার ও সম্পূর্ণ করে লিখুন বা বলুন, কোনো তথ্য লুকাবেন না, আর উত্তর পেলে তা বুঝে নিন। প্রয়োজনে প্রশ্ন আবার করুন।

ইফতা করতে কত বছর লাগে?

এটি প্রতিষ্ঠান ভেদে ভিন্ন হতে পারে। নির্দিষ্ট মেয়াদ ও শর্ত জানতে সংশ্লিষ্ট কোর্স পরিচালকের সাথে যোগাযোগ করুন।

এই লেখা পরিষদের সম্পাদনা পরিষদের পক্ষ থেকে সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য। ফিকহী বা আইনগত বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

#ইফতা#ফাতওয়া#ফিকহ#মুফতি#নিসাব

আরও পড়ুন

শিক্ষা ও পাঠদান

১৫ বছরের নিসাব: এক নজরে

পরিষদের ছয় মারহালা ও পনেরো বছরের শিক্ষা-কাঠামো সহজ ভাষায়: ইবতিদাইয়্যাহ থেকে তাকমীল পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের মেয়াদ ও উদ্দেশ্য।

৬ মিনিটে পড়া · ৬ নভেম্বর ২০২৬

শিক্ষা ও পাঠদান

ফিকহ ও উসূলে ফিকহ কেন পড়ানো হয়

মাদরাসায় ফিকহ ও উসূলে ফিকহ কেন পড়ানো হয় এবং ১৫ বছরের নিসাবে হানাফী ধারার ফিকহী কিতাবগুলো কোন স্তরে আসে, তার সহজ ব্যাখ্যা।

৬ মিনিটে পড়া · ৬ নভেম্বর ২০২৬

শিক্ষা ও পাঠদান

দাওরায়ে হাদীস কী ও কেন

দাওরায়ে হাদীস কী, কেন একে ১৫ বছরের নিসাবের তাকমীল বা সমাপ্তি পর্ব ধরা হয়, কোন কিতাবগুলো পড়ানো হয় এবং কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন।

৬ মিনিটে পড়া · ৬ নভেম্বর ২০২৬

তাযকিয়া ও আখলাক

সমাজে আলেমদের দায়িত্ব ও ভূমিকা

সমাজে আলেমদের শিক্ষা, দিকনির্দেশনা, চরিত্র ও সেবার দায়িত্ব কী এবং সাধারণ মানুষ কীভাবে আলেমদের সম্মান ও সহযোগিতা করতে পারেন, তা নিয়ে আলোচনা।

৬ মিনিটে পড়া · ৬ নভেম্বর ২০২৬