সংখ্যা নয়, মান: একটি বোর্ডের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য
৬ নভেম্বর ২০২৬ · ৫ মিনিটে পড়া · জমিরিয়া তা'লিম ও তায্কিয়া পরিষদ
একটি শিক্ষা বোর্ডের কাছে অন্তর্ভুক্ত মাদরাসার সংখ্যার চেয়ে সেই মাদরাসাগুলোর শিক্ষার মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বড় সংখ্যা দেখতে আকর্ষণীয়, কিন্তু প্রতিটি মাদরাসায় ঠিকমতো পড়াশোনা, স্বচ্ছ হিসাব ও ছাত্রদের নিরাপত্তা না থাকলে সেই সংখ্যার মূল্য কম। পরিষদের অন্তর্ভুক্তি-নীতিতেও বলা হয়েছে, সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে মান ধরে রাখাই লক্ষ্য। এই লেখায় দেখব, মানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অর্থ কী এবং এটি কীভাবে সবার জন্য কল্যাণকর।
"মান" বলতে এখানে কী বোঝানো হচ্ছে?
মান মানে শুধু পরীক্ষার নম্বর নয়। একটি মাদরাসার মানের কয়েকটি দিক আছে:
- যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং নিয়মিত বেতন।
- নিয়মিত ক্লাস, হাজিরা ও ছাত্রদের লেখা-পড়ার তদারকি।
- আখলাক, আদব ও তাযকিয়ার পরিবেশ।
- স্বচ্ছ হিসাব, রসিদ-ভাউচার ও নিয়মিত প্রতিবেদন।
- নিরাপদ ভবন ও শিশু সুরক্ষা।
- পরিষ্কার কাগজপত্র।
এই দিকগুলো একসাথে ঠিক থাকলে তবেই একটি মাদরাসাকে মানসম্পন্ন বলা যায়। অন্তর্ভুক্তির মাপকাঠির সাধারণ তালিকা আছে মাদরাসা অন্তর্ভুক্তির মাপকাঠি: কী কী থাকতে হবে লেখায়।
কেন সংখ্যার পেছনে ছোটা ঝুঁকিপূর্ণ?
সংখ্যার দিকে ঝুঁকলে মানের সাথে আপস করার প্রবণতা আসে। যাচাই-বাছাই কমে যায়, তদারকি পাতলা হয়ে যায়, আর দুর্বল প্রতিষ্ঠানও বোর্ডের নাম ব্যবহার করে। এর ফলে যারা সত্যিই ভালো কাজ করছে, তাদের পরিশ্রমও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
একই সাথে বেশি প্রতিষ্ঠান সামলাতে গিয়ে বোর্ডের সীমিত লোকবল ছড়িয়ে যায়। পরিদর্শন, অডিট ও প্রশিক্ষণ দুর্বল হলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ছাত্র ও অভিভাবকরা।
মান ধরে রাখতে বোর্ড কী করে?
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিষদ কয়েকটি কাঠামোগত ব্যবস্থার মাধ্যমে মান ধরে রাখার চেষ্টা করে:
- আবেদন যাচাই করে এবং প্রয়োজনে পরিদর্শন করে তবেই অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত দেয়।
- প্রতিটি মাদরাসা মাসিক প্রতিবেদন জমা দেয় এবং বছরে অডিট হয়।
- একই সিলেবাস, একই কেন্দ্রীয় পরীক্ষা ও মূল্যায়ন-মান বজায় থাকে।
- জেলাভিত্তিক আঞ্চলিক কমিটি তদারকি করে।
- ত্রুটি পাওয়া গেলে প্রথমে সংশোধনের সুযোগ দিয়ে লিখিত নির্দেশনা দেয়।
পরিদর্শনের সাধারণ ধারণা পেতে পড়তে পারেন তদারকি ও পরিদর্শন: কী দেখা হয়।
মাদরাসাকে কি পিছিয়ে রাখা হয়?
না, উদ্দেশ্য পিছিয়ে রাখা নয়। যে মাদরাসা এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়, তাকে প্রস্তুত হতে সহায়তা করাই লক্ষ্য। অপ্রস্তুত প্রতিষ্ঠানকে আগে গুছিয়ে নিতে বলা হয়, আর অন্তর্ভুক্তির পরেও ত্রুটি পেলে সংশোধনের সময় দেওয়া হয়। বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানকে মজবুত করার ভাবনা আছে নতুন মাদরাসা নয়, আগে বিদ্যমান মাদরাসাকে মজবুত করুন লেখায়।
বড় মাদরাসার সহযোগিতা এবং ছোট মাদরাসা থেকে উপরে মতামত, এই দুই ধারা মান বাড়ানোর কাজকে সহজ করে।
মানের সাথে সনদের সম্পর্ক কী?
সনদ হলো মানের লিখিত স্বীকৃতি। শিক্ষা ও মূল্যায়নের মান ঠিক না থাকলে সনদের আস্থাও কমে যায়। তাই সনদ কী প্রমাণ করবে, সেটি আলাদাভাবে ভাবার বিষয়। এ নিয়ে পড়ুন মাদরাসার সনদ কী প্রমাণ করবে লেখায়।
মান ধরে রাখা কেন কঠিন, আর কীভাবে সহজ হয়?
মান ধরে রাখা সহজ কাজ নয়। এতে সময়, ধৈর্য ও নিয়মিত পরিশ্রম লাগে, আর কখনো কখনো কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হয়। অনেক মাদরাসার সম্পদ সীমিত, শিক্ষক পাওয়া কঠিন এবং আয় অনিয়মিত। এই বাস্তবতা অস্বীকার না করে ধাপে ধাপে এগোনোই বুদ্ধিমানের কাজ।
কাজটি সহজ হয় যখন তিনটি জিনিস একসাথে চলে: স্পষ্ট মাপকাঠি যা সবাই আগে থেকে জানে, নিয়মিত তদারকি যা সহায়তার মনোভাব নিয়ে হয়, এবং খোলামেলা যোগাযোগ যেখানে মাদরাসা নিজের সমস্যা জানাতে ভয় পায় না। তখন মান শুধু নিয়ন্ত্রণের বিষয় থাকে না, সবার যৌথ দায়িত্ব হয়ে ওঠে।
অভিভাবক ও সমাজ কী করতে পারে?
অভিভাবক সন্তানের জন্য মাদরাসা বাছাইয়ের সময় ভবন বা প্রচারের চেয়ে পড়াশোনা, শিক্ষকের যোগ্যতা, নিরাপত্তা ও হিসাবের স্বচ্ছতার দিকে নজর দিতে পারেন। দাতারাও নিয়মিত প্রতিবেদন ও পরিচ্ছন্ন হিসাব আছে এমন প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন। এতে মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো উৎসাহ পায়।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে
এই বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের একটি করে নির্দেশনা দেখা যায়।
۞ إِنَّ ٱللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا۟ ٱلْأَمَٰنَٰتِ إِلَىٰٓ أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ ٱلنَّاسِ أَن تَحْكُمُوا۟ بِٱلْعَدْلِ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِۦٓ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ سَمِيعًۢا بَصِيرًۭا
নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদিগকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষের কোন বিচার-মীমাংসা করতে আরম্ভ কর, তখন মীমাংসা কর ন্যায় ভিত্তিক। আল্লাহ তোমাদিগকে সদুপদেশ দান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।
সূরা নিসা, আয়াত ৪:৫৮আমানত যোগ্য হাতে তুলে দেওয়া এবং ন্যায়ের সাথে বিচার করার এই নির্দেশ পরীক্ষা, মূল্যায়ন ও সনদ প্রদানে সততার ভিত্তি।
الدِّينُ النَّصِيحَةُ قُلْنَا لِمَنْ قَالَ لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ
ভাবার্থ: দ্বীন হলো কল্যাণকামনা: আল্লাহ, তাঁর কিতাব, রাসূল, মুসলিম নেতৃত্ব ও সাধারণ মুসলিমের জন্য।
সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৫দ্বীন হলো কল্যাণকামনা। বোর্ড, মাদরাসা ও শিক্ষক একে অপরের ভালো চাইলে নিয়ম ও পরামর্শ দুটোই সহজে মানা যায়।
সংক্ষেপে করণীয়
- মাদরাসা পরিচালকরা সংখ্যা নয়, শিক্ষক, পাঠদান, হিসাব ও নিরাপত্তার মানকে অগ্রাধিকার দিন।
- অন্তর্ভুক্তির আগে মাপকাঠির তালিকা অনুযায়ী নিজেকে যাচাই করে নিন।
- মাসিক প্রতিবেদন ও বার্ষিক অডিট সময়মতো সম্পন্ন করুন।
- ত্রুটি ধরা পড়লে সংশোধনের সুযোগকে কাজে লাগান।
- অভিভাবক ও দাতারা মান ও স্বচ্ছতা দেখে সিদ্ধান্ত নিন।
প্রশ্নোত্তর
সংখ্যার চেয়ে মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ কেন?
কারণ প্রতিটি ছাত্রের শিক্ষার ওপর মান সরাসরি প্রভাব ফেলে, অথচ সংখ্যা তা বলে না। মানহীন প্রতিষ্ঠান বাড়লে ছাত্র, অভিভাবক ও দাতার আস্থা কমে। মান ঠিক থাকলে সংখ্যা ধীরে ধীরে এমনিতেই সঠিকভাবে বাড়ে।
মান যাচাই কীভাবে হয়?
সাধারণত আবেদনের কাগজ যাচাই, পরিদর্শন, মাসিক প্রতিবেদন ও বার্ষিক অডিট এবং কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ফলের মাধ্যমে। এতে পড়াশোনা, শৃঙ্খলা, শিশু নিরাপত্তা, হিসাব ও পরিবেশের অবস্থা দেখা হয়।
আমার মাদরাসা এখনো প্রস্তুত নয়, কী করব?
হতাশ হবেন না। ঘাটতিগুলো তালিকা করে ধাপে ধাপে ঠিক করুন, প্রয়োজনে অভিজ্ঞ মাদরাসা বা আঞ্চলিক কমিটির পরামর্শ নিন। প্রস্তুত হয়ে আবেদন করুন অন্তর্ভুক্তির আবেদন পাতায়।
মানের নামে কি ছোট মাদরাসা বাদ পড়বে?
লক্ষ্য ছোট মাদরাসা বাদ দেওয়া নয়। মাপকাঠি আকারের নয়, ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও পাঠদানের ভিত্তিতে। ছোট কিন্তু গোছানো মাদরাসা মানসম্পন্ন হতে পারে।
এই লেখা পরিষদের সম্পাদনা পরিষদের পক্ষ থেকে সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য। ফিকহী বা আইনগত বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
