হাদীস কেন পড়ানো হয়
৬ নভেম্বর ২০২৬ · ৫ মিনিটে পড়া · জমিরিয়া তা'লিম ও তায্কিয়া পরিষদ
মাদরাসায় হাদীস পড়ানো হয় এই কারণে যে, নবী করীম (সা.)-এর কথা, কাজ ও অনুমোদনের মাধ্যমেই কুরআনের শিক্ষা বাস্তব জীবনে কীভাবে চলবে তা জানা যায়। হাদীস না জানলে ইবাদত, আখলাক ও লেনদেনের পূর্ণ ছবি পাওয়া কঠিন। তাই কওমী ধারার নিসাবে হাদীস শুরু হয় ছোট বয়সের সহজ পাঠ দিয়ে, আর শেষ হয় শেষ বছরের দাওরায়ে হাদীসে।
হাদীস বলতে আমরা কী বুঝি?
হাদীস হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী, তাঁর আমল এবং তাঁর সামনে করা কোনো কাজে তাঁর সম্মতি, যা বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছেছে। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ধারায় কুরআনের পরেই হাদীসকে দ্বীনের দ্বিতীয় মূল উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়। কুরআনে সালাতের নির্দেশ আছে; সালাত কীভাবে আদায় হবে, সেই ব্যবহারিক রূপ আমরা পাই নবীজির আমল থেকে।
কোন বর্ণনা কতটা নির্ভরযোগ্য, সেই বিচার অত্যন্ত সূক্ষ্ম কাজ। সে কারণে এটি অভিজ্ঞ আলেমদের দায়িত্ব। সাধারণ পাঠক ও অভিভাবকের কাজ হলো নির্ভরযোগ্য শিক্ষকের কাছ থেকে শেখা, নিজে নিজে সিদ্ধান্ত না নেওয়া।
মাদরাসার শিক্ষার্থী হাদীস পড়ে কী পায়?
হাদীস পড়ার ফল এক জায়গায় থামে না। একজন শিক্ষার্থী সাধারণত এগুলো পায়:
- সুন্নাহর আলোকে জীবন গড়ার দিকনির্দেশ। দৈনন্দিন আদব, দোয়া, খাওয়া-ঘুম ও আচরণের শিক্ষা।
- নবীজির প্রতি ভালোবাসা ও পরিচিতি। তাঁর জীবনচরিত, চরিত্র ও শামায়েল পড়ে অন্তরে সম্পর্ক তৈরি হয়।
- ফিকহ ও তাফসীর বোঝার ভিত। মাসআলার দলিল কোথা থেকে এসেছে, তা বোঝার জন্য হাদীসের জ্ঞান লাগে।
- তাযকিয়ার উপকরণ। যুহদ, রিকাক ও আখলাকের হাদীস মনকে নরম করে এবং আত্মশুদ্ধির পথ দেখায়।
এই কারণেই হাদীস শুধু মুখস্থের বিষয় নয়; এটি আমলের সাথে জড়িত একটি শিক্ষা। এ বিষয়ে আরও জানতে পড়তে পারেন দ্বীনী শিক্ষা কেন জরুরি।
নিসাবে হাদীস কোন স্তরে কীভাবে আসে?
পরিষদের ১৫ বছরের নিসাবে হাদীস একসঙ্গে শুরু হয় না; ধাপে ধাপে বাড়ে। পুরো তালিকা দেখা যাবে পাঠ্যসূচি পাতায়।
- ইবতিদাইয়্যাহ স্তরের শুরুতে: নূরানী ১ম ও ২য় শ্রেণির বিষয়তালিকায় কালিমা ও হাদীস এবং হাদীস আছে। এখানে ছোট ছোট শিক্ষা মুখস্থ ও অভ্যাসের মাধ্যমে আসে।
- ছানাবিয়্যাহ আম্মাহ, দ্বিতীয় বছর: পাঞ্জুম শ্রেণিতে হাদীস বিষয় এবং "হিফজুল হাদীস" নামের কিতাব রয়েছে।
- ছানাবিয়্যাহ খাসসাহ ও ফযীলাহ: হাদীস বিষয় আগের মতো চলতে থাকে, সাথে আরবি ভাষা ও উসূলের দক্ষতা বাড়ে। ফযীলাহ ২য় বর্ষে মিশকাত (১ম ও ২য়) পড়ানো হয়।
- তাকমীল, অর্থাৎ দাওরায়ে হাদীস: শেষ বছরে বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, শামায়েলে তিরমিযী, মুয়াত্তা ও ত্বহাবী পড়ানো হয়।
লক্ষ করার বিষয় হলো, দাওরায় পৌঁছানোর আগে বহু বছরের ভাষা ও ফিকহের প্রস্তুতি আছে। এর বিস্তারিত ধারণার জন্য ১৫ বছরের নিসাব: এক নজরে লেখাটি সাহায্য করবে।
হাদীস বোঝার জন্য আগে কী কী শিখতে হয়?
হাদীসের কিতাব আরবি ভাষায়। তাই নাহু, সরফ ও আরবি সাহিত্যের দক্ষতা ছাড়া হাদীস ঠিকভাবে বোঝা কঠিন। এই কারণে নিসাবে প্রথম কয়েক বছর ভাষার ভিত গড়ায় জোর দেওয়া হয়।
এর সাথে লাগে হাদীস বর্ণনার নিয়মনীতি জানা, যাকে উসূলে হাদীস বলা হয়। নিসাবে ফযীলাহ ২য় বর্ষে "নুখবাতুল ফিকার" এবং দাওরার বিষয়তালিকায় উসূলে হাদীস রাখা হয়েছে। বিস্তারিত পড়তে পারেন উলূমুল হাদীস কেন পড়ানো হয় লেখায়।
শুধু কিতাব পড়লেই কি হাদীসের শিক্ষা পূর্ণ হয়?
না। হাদীসের শিক্ষা পূর্ণ হয় কিতাবের সাথে শিক্ষকের সান্নিধ্য, আদব ও আমলে। ঐতিহ্যগতভাবে এই শিক্ষা উস্তাদের কাছ থেকে শুনে, বুঝে ও অনুসরণ করে নেওয়া হয়। শিক্ষার্থী যদি শুধু তথ্য জমায় কিন্তু আচরণে পরিবর্তন না আসে, তবে হাদীস পড়ার মূল উদ্দেশ্য অপূর্ণ থাকে।
অভিভাবক হিসেবে আপনি সন্তানের আচরণে ছোট ছোট পরিবর্তন দেখে বুঝতে পারবেন সে কী শিখছে: সালামের অভ্যাস, বড়দের প্রতি সম্মান, সত্য বলার চেষ্টা। এগুলো হাদীস শিক্ষার বাস্তব ফল।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে
এই বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের একটি করে নির্দেশনা দেখা যায়।
أَمَّنْ هُوَ قَٰنِتٌ ءَانَآءَ ٱلَّيْلِ سَاجِدًۭا وَقَآئِمًۭا يَحْذَرُ ٱلْءَاخِرَةَ وَيَرْجُوا۟ رَحْمَةَ رَبِّهِۦ ۗ قُلْ هَلْ يَسْتَوِى ٱلَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَٱلَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ ۗ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُو۟لُوا۟ ٱلْأَلْبَٰبِ
যে ব্যক্তি রাত্রিকালে সেজদার মাধ্যমে অথবা দাঁড়িয়ে এবাদত করে, পরকালের আশংকা রাখে এবং তার পালনকর্তার রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এরূপ করে না; বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।
সূরা যুমার, আয়াত ৩৯:৯ইলমের মর্যাদা বোঝাতে এই আয়াত বারবার পড়া হয়। যাঁরা শেখেন ও শেখান, তাঁদের প্রতি সম্মান ও যত্ন মাদরাসার পরিবেশের অংশ হওয়া উচিত।
… مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ إِلاَّ نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلاَئِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ وَمَنْ بَطَّأَ بِهِ عَمَلُهُ لَمْ يُسْرِعْ بِهِ نَسَبُهُ
ভাবার্থ: যে ব্যক্তি ইলম অর্জনের পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।
সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৯৯ইলম অর্জনের পথকে আল্লাহ জান্নাতের পথ সহজ করে দেন বলে জানানো হয়েছে। শিক্ষক ও তালিবে ইলম উভয়ের জন্য এটি বড় উৎসাহ।
সংক্ষেপে করণীয়
- সন্তানকে শুরু থেকেই ছোট ছোট দোয়া ও সুন্নাহর আদব শেখানোয় উৎসাহ দিন।
- হাদীসের ব্যাখ্যা ও মাসআলার জন্য নির্ভরযোগ্য আলেম ও শিক্ষকের কাছে যান।
- অনলাইনে পাওয়া যে কোনো বর্ণনা যাচাই না করে ছড়াবেন না।
- নিসাবের স্তর অনুযায়ী ধৈর্য ধরুন; দাওরার আগে ভাষা ও ফিকহের প্রস্তুতি দরকার।
- সন্তানের পাঠের সাথে ঘরেও আমলের পরিবেশ রাখুন।
প্রশ্নোত্তর
হাদীস কি কুরআন ছাড়া আলাদা কিছু?
কুরআন আল্লাহর কালাম এবং দ্বীনের প্রথম উৎস। হাদীস কুরআনের ব্যাখ্যা ও বাস্তব প্রয়োগ বোঝাতে সাহায্য করে। উভয়কে একসাথে বোঝাই আহলুস সুন্নাহর ধারা। বিস্তারিত বিষয়ে আলেমের কাছে শিখুন।
ছোট ক্লাসে কি সত্যিই হাদীস পড়ানো হয়?
হ্যাঁ, তবে অতি সহজ আকারে। পরিষদের পাঠ্যসূচিতে নূরানী ১ম ও ২য় শ্রেণির বিষয়ের মধ্যে হাদীসের উল্লেখ আছে। এখানে লক্ষ্য হলো সুন্দর আদব ও ছোট শিক্ষা মনে গেঁথে দেওয়া, জটিল আলোচনা নয়।
দাওরায়ে হাদীস না করলে কি হাদীসের শিক্ষা অসম্পূর্ণ?
প্রতিটি ধাপে হাদীসের কিছু না কিছু অংশ আসে, আর দাওরা হলো নিসাবের সমাপ্তি পর্ব যেখানে প্রধান কিতাবগুলো একসাথে পড়ানো হয়। কারও জীবনের অবস্থা অনুযায়ী পরামর্শ ভিন্ন হতে পারে; সন্তানের জন্য সিদ্ধান্ত নিতে শিক্ষকদের সাথে কথা বলুন। বিস্তারিত জানতে দাওরায়ে হাদীস কী ও কেন পড়ুন।
হাদীসের কোনো বর্ণনা নিয়ে সন্দেহ হলে কী করব?
নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির কাছ থেকে জেনে নিন। হাদীসের মান ও ব্যাখ্যা বিশেষজ্ঞ বিষয়।
এই লেখা পরিষদের সম্পাদনা পরিষদের পক্ষ থেকে সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য। ফিকহী বা আইনগত বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
