সৎ সঙ্গ ও বন্ধু নির্বাচন: ছাত্র ও যুবকদের জন্য
৬ নভেম্বর ২০২৬ · ৫ মিনিটে পড়া · জমিরিয়া তা'লিম ও তায্কিয়া পরিষদ
মানুষ তার সঙ্গীর স্বভাব দ্বারা অনেক প্রভাবিত হয়, তাই সৎ সঙ্গ ও ভালো বন্ধু নির্বাচন চরিত্র গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভালো বন্ধু ভালো কাজে উৎসাহ দেন, ভুলে সংশোধন করেন এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকেন। আর খারাপ সঙ্গ ধীরে ধীরে আগ্রহ, অভ্যাস ও চিন্তাকে নষ্ট করে দিতে পারে।
সৎ সঙ্গ এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
আমরা অজান্তেই কাছের মানুষদের কথা, চালচলন ও আগ্রহ গ্রহণ করি। এ কারণে আহলে সুন্নাতের আলেমগণ ও আকাবির সবসময় সৎ সোহবতের গুরুত্ব বলে এসেছেন। হাদীসে বন্ধুর প্রভাব নিয়ে সুপরিচিত শিক্ষা আছে; তার সুনির্দিষ্ট ভাষ্য ও ব্যাখ্যা নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে জেনে নিন।
বাস্তবে একজন তালিবে ইলমের জীবনে ভালো বন্ধু মানে:
- পড়ায় সহযোগিতা ও পুনরাবৃত্তির সঙ্গী।
- নামাজ ও ইবাদতে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মানুষ।
- ভুল করলে বিনয়ের সাথে সংশোধনকারী।
- দুঃখের সময় সান্ত্বনাদাতা।
ভালো বন্ধু কীভাবে চেনা যায়?
বন্ধুত্বের আগে কয়েকটি বিষয় লক্ষ করা ভালো:
- তাঁর কথায় সততা আছে কি না।
- ফরজ ইবাদত ও আচরণে সতর্কতা আছে কি না।
- উস্তাদ, মা-বাবা ও অন্যদের সম্মান করেন কি না।
- তাঁর সাথে থাকলে আপনি ভালো কাজের দিকে যান, না সময় নষ্টের দিকে।
- অন্যের গীবত, ঠাট্টা ও অশালীনতায় তিনি অভ্যস্ত কি না।
- আপনার সাফল্যে তিনি খুশি হন কি না।
পরিপূর্ণ মানুষ পাওয়া কঠিন; সবার দুর্বলতা আছে। তাই এমন সঙ্গীর খোঁজ করুন, যাঁর সাথে মেশার ফলে মোটের ওপর আপনি ভালোর দিকে এগোন।
খারাপ সঙ্গের লক্ষণ কী?
কিছু সঙ্গের লক্ষণ সতর্ক হওয়ার ইঙ্গিত দেয়:
- পড়া, নামাজ বা নিয়ম নিয়ে ঠাট্টা করা।
- নিষিদ্ধ কাজে ডাকা বা চাপ দেওয়া।
- মিথ্যা বলা ও ফাঁকি দেওয়ার অভ্যাস।
- সময় ও টাকা নষ্ট করানো।
- মাদরাসার নিয়ম ভাঙতে উসকানি দেওয়া।
- উস্তাদ বা পরিবারের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো।
এমন সঙ্গ থেকে ধীরে ও বুদ্ধিমত্তার সাথে দূরে সরে আসা ভালো। কাউকে অপমান বা শত্রু বানানোর প্রয়োজন নেই; বিনয়ের সাথে নিজের সীমা জানিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট।
খারাপ সঙ্গ ছাড়তে হলে কী করব?
অনেকেই বন্ধু হারানোর ভয়ে খারাপ সঙ্গে থেকে যান। কয়েকটি উপায়:
- বিকল্প খুঁজুন: আগে ভালো একজন বন্ধু বা পড়ার গ্রুপ গড়ে তুলুন।
- সময়সূচি বদলান: যে সময়ে ও জায়গায় সমস্যা হয়, সেখানে কম যান।
- সোজাসুজি কিন্তু নম্রভাবে না বলুন: আমি এটা করব না, এ কথা শান্তভাবে বলা যায়।
- সাহায্য নিন: বিশ্বস্ত উস্তাদ বা মুরব্বিকে পরিস্থিতি জানান।
- দোয়া করুন: ভালো সঙ্গ ও হেদায়েতের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
বদ-অভ্যাস থেকে সন্তান বা ছাত্রকে বাঁচানোর বিষয়ে অভিভাবকরা কিশোরদের বদ-অভ্যাস থেকে বাঁচানো লেখাটি পড়তে পারেন।
বন্ধুত্বে আদব কেমন হওয়া উচিত?
ভালো বন্ধু হতে হলে নিজেকেও কিছু আদব মানতে হয়:
- বন্ধুর অসাক্ষাতে তার গীবত না করা।
- গোপন কথা আমানত রাখা।
- অতিরিক্ত ঠাট্টা বা কাউকে খাটো করা থেকে বিরত থাকা।
- সাধ্যমতো সাহায্য করা এবং কৃতজ্ঞ থাকা।
- ভুল দেখলে একান্তে নম্রভাবে সংশোধন করা।
- বন্ধুর জন্য দোয়া করা।
বড়দের ও ইসলাহি মজলিসের সোহবত
সমবয়সী বন্ধুর পাশাপাশি অভিজ্ঞ ও আল্লাহওয়ালা মুরব্বির সোহবত তাযকিয়ার জন্য খুব উপকারী বলে আলেমগণ বলেন। বড়দের সাথে বসলে সহজে আদব, ধৈর্য ও আমলের ধারণা পাওয়া যায়। বিস্তারিত জানতে ইসলাহি মজলিসের উপকারিতা লেখাটি দেখুন।
শুরু করবেন কীভাবে?
ভালো বন্ধু খোঁজা বা বন্ধুত্ব যাচাই করা একটি সচেতন কাজ। প্রথমে নিজের বর্তমান বন্ধুদের তালিকা করুন এবং প্রত্যেকের সাথে সময় কাটালে আপনি কী হন, তা সৎভাবে ভাবুন।
- যাদের সাথে থাকলে ইবাদত ও পড়ালেখায় মন বসে, তাদের কাছে থাকুন।
- যাদের সঙ্গে সময় নষ্ট বা অশ্লীল কথায় কাটে, তাদের থেকে ধীরে ধীরে দূরত্ব রাখুন, কাউকে অপমান না করে।
- নতুন বন্ধু খুঁজতে মাদরাসার পড়ার দল, ইসলাহী মজলিস বা সৎকাজের আয়োজনে যোগ দিন।
- বন্ধুর ভুল দেখলে একান্তে নম্রভাবে বলুন।
- নিজেও এমন বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করুন, যার সাথে থাকলে অন্যের উপকার হয়।
একটি সাধারণ দৃশ্য
এক ছাত্র কিছুদিন ধরে পড়ায় অমনোযোগী হয়ে পড়েছিল। শিক্ষক খেয়াল করলেন, সে নতুন একটি দলের সাথে রাতে অনেক দেরি পর্যন্ত গল্প করে। তিনি তাকে ধমক না দিয়ে একজন মেধাবী ও সৎ সহপাঠীর সাথে পড়ার জুটি বানিয়ে দিলেন। ধীরে ধীরে ছেলেটির সময়ের অভ্যাস বদলাল এবং পড়ায় আবার উন্নতি হলো।
ভালো ও খারাপ সঙ্গের লক্ষণ
| লক্ষণ | ভালো সঙ্গ | খারাপ সঙ্গ |
|---|---|---|
| আলোচনা | ইলম ও উপকারী কথা | গীবত ও অর্থহীন কথা |
| সময় | নিয়মমাফিক | অপচয় ও রাত জাগা |
| ভুলের সময় | নম্র সংশোধন | উৎসাহ বা ঠাট্টা |
অভিভাবক ও শিক্ষকের ভূমিকা
শিশুকে শুধু বারণ করলে হয় না, বিকল্প সুন্দর পরিবেশ দিতে হয়। খেলাধুলা, দলগত পড়া ও সৎকাজের সুযোগ তৈরি করে দিন।
আরও জানতে গীবত ও হিংসা থেকে বাঁচা এবং যুবকদের মন্দ অভ্যাস থেকে বাঁচানো লেখা দুটি পড়ুন।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে
এই বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের একটি করে নির্দেশনা দেখা যায়।
لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِى رَسُولِ ٱللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌۭ لِّمَن كَانَ يَرْجُوا۟ ٱللَّهَ وَٱلْيَوْمَ ٱلْءَاخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرًۭا
যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।
সূরা আহযাব, আয়াত ৩৩:২১আদর্শ চরিত্রের মাপকাঠি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন। ছোট ছোট আচরণে তাঁর অনুসরণই তাযকিয়ার বাস্তব পথ।
خِيَارُكُمْ أَحَاسِنُكُمْ أَخْلاَقًا . وَلَمْ يَكُنِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَاحِشًا وَلاَ مُتَفَحِّشًا . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ
ভাবার্থ: কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে প্রিয় ও নিকটে থাকবে তোমাদের মধ্যে যারা সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী।
জামে তিরমিযী, হাদীস নং ১৯৭৫ (আলবানীর মতে সহীহ)ভালো চরিত্র আখিরাতে নৈকট্যের কারণ। আখলাক শুধু জানার বিষয় নয়, রোজকার আচরণে চর্চা করার বিষয়।
সংক্ষেপে করণীয়
- বন্ধু বাছাইয়ের আগে তার আচরণ ও প্রভাব লক্ষ করুন।
- পড়ায় ও ইবাদতে সহায়ক দু-একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু গড়ুন।
- ক্ষতিকর সঙ্গ থেকে নম্রভাবে দূরে সরুন।
- নিজেও বন্ধুর জন্য আমানতদার ও কল্যাণকামী হোন।
- অভিজ্ঞ মুরব্বির সোহবত ও পরামর্শ নিন।
প্রশ্নোত্তর
বন্ধুরা খারাপ হলে কি সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করতে হবে?
প্রতিটি পরিস্থিতি আলাদা। ক্ষতিকর কাজে জড়ানোর আশঙ্কা থাকলে দূরত্ব রাখা ভালো, তবে নম্রতা ও দোয়া বজায় রাখুন। সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ মুরব্বির পরামর্শ নিন।
অভিভাবক সন্তানের বন্ধু নিয়ে কী করবেন?
সন্তানের সাথে ভরসার সম্পর্ক রাখুন, তার বন্ধুদের সম্পর্কে জানুন এবং ধমকের বদলে বুঝিয়ে বলুন। ভালো সঙ্গের সুযোগ তৈরিতে সাহায্য করুন।
একা থাকা কি ভালো?
পুরোপুরি একা থাকা সবসময় ভালো নয়। সীমিত সংখ্যক ভালো বন্ধু ও নিজের নির্জন সময়ের ভারসাম্যই সুস্থ।
বন্ধুর ভুল সংশোধন কীভাবে করব?
একান্তে, নম্র ভাষায় ও ভালোবাসার সাথে বলুন। সবার সামনে বললে সে অপমানিত বোধ করতে পারে এবং কথা গ্রহণ নাও করতে পারে।
এই লেখা পরিষদের সম্পাদনা পরিষদের পক্ষ থেকে সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য। ফিকহী বা আইনগত বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
