গীবত ও হিংসা থেকে বাঁচার উপায়
৬ নভেম্বর ২০২৬ · ৬ মিনিটে পড়া · জমিরিয়া তা'লিম ও তায্কিয়া পরিষদ
গীবত মানে কারও অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষের কথা বলা, যা সে শুনলে খারাপ লাগত, আর হিংসা মানে অন্যের নেয়ামত দেখে কষ্ট পাওয়া এবং তা তার কাছ থেকে চলে যাওয়ার ইচ্ছা করা। ইসলামে দুটি বিষয়ই গুরুতর গুনাহ হিসেবে গণ্য। এ দুই রোগ থেকে বাঁচার মূল উপায় হলো অন্তরের সংশোধন, জিহ্বার হেফাজত এবং সৎ পরিবেশ।
গীবত কী এবং কেন এটি ক্ষতিকর?
গীবত নিয়ে কুরআনে কঠোর সতর্কবার্তা আছে এবং হাদীসেও এর সংজ্ঞা ও নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যায়। সুনির্দিষ্ট ভাষ্য ও ব্যাখ্যা নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে জেনে নিন। সাধারণ বোধে গীবত ক্ষতিকর, কারণ:
- এটি মানুষের মর্যাদা ও সম্মান নষ্ট করে।
- সম্পর্কে অবিশ্বাস, শত্রুতা ও বিভেদ তৈরি করে।
- সময় ও নেকি দুটোই নষ্ট হয়।
- ধীরে ধীরে অন্তরকে কঠিন করে ফেলে।
মাদরাসার পরিবেশে গীবত সহজেই ঢুকে পড়ে, যেমন সহপাঠী, উস্তাদ বা কমিটি নিয়ে বসে সমালোচনা। এতে পরিবেশের বরকত ও ঐক্য নষ্ট হয়।
হিংসা কী এবং কীভাবে চেনা যায়?
হিংসা এমন একটি অন্তরের রোগ, যা অন্যের ভালো অবস্থা দেখে ভেতরে জ্বালা তৈরি করে। এর কিছু লক্ষণ:
- সহপাঠীর ভালো ফলে মন খারাপ হওয়া।
- অন্যের প্রশংসা শুনলে অস্বস্তি বোধ করা।
- কারও ক্ষতি হলে ভেতরে ভেতরে খুশি হওয়া।
- অন্যের সাফল্য ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করা।
এই অবস্থা নিজের মধ্যে টের পেলে হতাশ হবেন না। অনুভূতি আসা এক জিনিস, আর সেই অনুযায়ী কাজ করা অন্য জিনিস। আলেমগণ বলেন, মনে এ ধরনের চিন্তা এলে তা অনুসরণ না করে দূর করার চেষ্টা করতে হবে। হিংসা ও আগ্রহের পার্থক্য এবং বিস্তারিত বিধান নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে জেনে নিন।
গীবত থেকে বাঁচার ব্যবহারিক উপায়
- কথা বলার আগে ভাবা: যা বলছি, তা কি সত্য, প্রয়োজনীয় ও উপকারী?
- আলোচনা বদলে দেওয়া: কেউ গীবত শুরু করলে ভদ্রভাবে অন্য বিষয়ে কথা ঘুরিয়ে দেওয়া।
- সরে যাওয়া: পরিবেশ বদলানো সম্ভব না হলে বিনয়ের সাথে উঠে যাওয়া।
- অন্যের ভালো দিক বলা: কারও সম্পর্কে ভালো দিক বলার অভ্যাস করা।
- সমস্যা থাকলে সমাধানের জন্য সঠিক ব্যক্তিকে জানানো: যেমন সমস্যা সমাধান করতে পারেন এমন দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় বিষয় জানানো এবং অকারণে প্রচার না করা।
- ক্ষমা চাওয়া: গীবত করে ফেললে তাওবা করা এবং সম্ভব ও নিরাপদ হলে ক্ষমা চাওয়া; কীভাবে করবেন, তা মুফতির কাছে জেনে নিন।
হিংসা দূর করার ব্যবহারিক উপায়
- নেয়ামত বণ্টন আল্লাহর হাতে, এ কথা স্মরণ করা: আমার অংশ আমার কাছেই আছে।
- অন্যের জন্য দোয়া করা: যার প্রতি হিংসা হয়, তার জন্য কল্যাণের দোয়া করলে অন্তর নরম হয়।
- নিজের নেয়ামত গোনা: সবর ও শোকর-এর চর্চা হিংসা কমাতে সাহায্য করে।
- নিজের উন্নতিতে মন দেওয়া: তুলনার বদলে নিজের লক্ষ্যে মনোযোগ দেওয়া।
- সুস্থ আগ্রহ গড়া: অন্যের ভালো গুণ দেখে নিজেও তা অর্জনের চেষ্টা করা, তার ক্ষতি কামনা না করে।
- বিনয় অনুশীলন: অহংকার হিংসার বড় কারণ। বিনয় ও অহংকার লেখাটি দেখতে পারেন।
মাদরাসার পরিবেশে এই রোগ কীভাবে কমানো যায়?
শিক্ষক ও দায়িত্বশীলরা পরিবেশ গড়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন:
- ছাত্রদের সামনে কারও গীবত বা ঠাট্টা না করা।
- সবার ভালো কাজের প্রশংসা ন্যায্যভাবে করা এবং অকারণ তুলনা না করা।
- ফলাফলের তুলনার বদলে প্রচেষ্টা ও উন্নতিকে গুরুত্ব দেওয়া।
- মতপার্থক্য থাকলে সরাসরি ও ভদ্রভাবে আলোচনার সংস্কৃতি গড়া।
- ছাত্রদের জন্য নিয়মিত নসিহত ও ইসলাহি পরিবেশের ব্যবস্থা রাখা।
নিজেকে পরীক্ষা করার সহজ উপায়
প্রতিদিন রাতে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে পারেন: আজ কারও সম্পর্কে অনুপস্থিতিতে খারাপ কথা বলেছি কি? কারও ভালো দেখে মন খারাপ হয়েছে কি? এই অভ্যাস ধীরে ধীরে সচেতনতা বাড়ায়।
একটি সাত দিনের ছোট অনুশীলন
- দিন ১: আজ কারো অনুপস্থিতিতে তার সমালোচনা করব না।
- দিন ২: কারো ভালো কাজে মনে মনে দোয়া করব।
- দিন ৩: গীবতের আসর শুরু হলে বিষয় বদলে দেব।
- দিন ৪: যার প্রতি মনে কষ্ট আছে, তার একটি ভালো গুণ লিখব।
- দিন ৫: কারো সাফল্যে অভিনন্দন জানাব।
- দিন ৬: নিজের প্রাপ্ত নিয়ামতের তালিকা করব।
- দিন ৭: সপ্তাহ মূল্যায়ন করে ইস্তিগফার করব।
একটি সাধারণ দৃশ্যপট
এক হোস্টেলে ছাত্ররা অবসরে প্রায়ই অনুপস্থিত সহপাঠীদের নিয়ে কথা বলত। একজন ছাত্র নিয়ম করল, সে এ ধরনের আলাপে অংশ নেবে না, বরং নম্রভাবে বলবে, তার সামনে বলাটাই ভালো। প্রথমে ঠাট্টা শুনতে হলো, কিন্তু কিছুদিন পর অন্যরাও সচেতন হলো।
সাধারণ ভুল ও সংশোধন
- ভুল: "আমি তো সত্যই বলছি" বলে গীবতকে বৈধ ভাবা। সংশোধন: বৈধ ব্যতিক্রম আছে কি না, তা আলেমের কাছে জানুন।
- ভুল: হিংসাকে চেপে রাখা, দূর না করা। সংশোধন: বিনয়ের চর্চা ও দোয়া করুন।
- ভুল: ক্ষমা না চেয়ে ভুলে যাওয়া। সংশোধন: তাওবা ও ইস্তিগফার করুন এবং যার ক্ষতি হয়েছে তার কাছে ক্ষমা চান।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে
এই বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের একটি করে নির্দেশনা দেখা যায়।
لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِى رَسُولِ ٱللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌۭ لِّمَن كَانَ يَرْجُوا۟ ٱللَّهَ وَٱلْيَوْمَ ٱلْءَاخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرًۭا
যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।
সূরা আহযাব, আয়াত ৩৩:২১আদর্শ চরিত্রের মাপকাঠি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন। ছোট ছোট আচরণে তাঁর অনুসরণই তাযকিয়ার বাস্তব পথ।
خِيَارُكُمْ أَحَاسِنُكُمْ أَخْلاَقًا . وَلَمْ يَكُنِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَاحِشًا وَلاَ مُتَفَحِّشًا . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ
ভাবার্থ: কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে প্রিয় ও নিকটে থাকবে তোমাদের মধ্যে যারা সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী।
জামে তিরমিযী, হাদীস নং ১৯৭৫ (আলবানীর মতে সহীহ)ভালো চরিত্র আখিরাতে নৈকট্যের কারণ। আখলাক শুধু জানার বিষয় নয়, রোজকার আচরণে চর্চা করার বিষয়।
সংক্ষেপে করণীয়
- কথা বলার আগে ভাবুন: এটি সত্য, দরকারি ও উপকারী কি না।
- গীবতের আসর থেকে ভদ্রভাবে সরে যান বা প্রসঙ্গ বদলান।
- হিংসা এলে সেই ব্যক্তির জন্য দোয়া করুন এবং নিজের নেয়ামত স্মরণ করুন।
- ভুল করে ফেললে তাওবা করুন এবং সংশোধনের চেষ্টা করুন।
- সৎ সঙ্গ ও ইসলাহি পরিবেশে থাকুন।
প্রশ্নোত্তর
কারও খারাপ আচরণ সম্পর্কে কাউকে জানানো কি গীবত?
প্রয়োজনে সমস্যা সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলকে জানানো এবং অকারণে প্রচার করার মধ্যে পার্থক্য আছে। কোন ক্ষেত্রে কতটুকু অনুমোদিত, তা নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে জেনে নিন।
হিংসা মনে এলেই কি গুনাহ হয়ে যায়?
আলেমগণের সাধারণ আলোচনা অনুযায়ী, মনে ভাব আসা এক কথা, আর তা লালন করা ও সে অনুযায়ী আচরণ করা অন্য কথা। এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে জানুন এবং মন থেকে দূর করার চেষ্টা চালিয়ে যান।
সবাই গীবত করলে আমি একা কী করব?
নম্রভাবে প্রসঙ্গ বদলান বা সরে যান। প্রথমে কঠিন মনে হলেও কিছুদিন পর অনেকে আপনার আচরণ দেখে সতর্ক হতে পারে।
বন্ধুর ভালো ফলে ঈর্ষা হলে কী করব?
তার জন্য দোয়া করুন, অভিনন্দন জানান এবং নিজের উন্নতির পরিকল্পনা করুন। এতে হিংসা ধীরে ধীরে সুস্থ প্রেরণায় বদলে যেতে পারে।
এই লেখা পরিষদের সম্পাদনা পরিষদের পক্ষ থেকে সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য। ফিকহী বা আইনগত বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
