মা-বাবার জন্য হেদায়েতের কথা
৬ নভেম্বর ২০২৬ · ৬ মিনিটে পড়া · জমিরিয়া তা'লিম ও তায্কিয়া পরিষদ
সন্তানের হেদায়েত ও সঠিক গড়নের জন্য মা-বাবার তিনটি কাজ সবচেয়ে বড়: আন্তরিক দোয়া, নিজের আমলে দৃষ্টান্ত হওয়া এবং ধৈর্যের সাথে সময় দেওয়া। হেদায়েত দেওয়ার মালিক আল্লাহ; কিন্তু চেষ্টা করা এবং পরিবেশ তৈরি করা আমাদের দায়িত্ব। এই লেখায় ঘরের বাস্তব জীবনে কাজে লাগে, এমন কিছু পরামর্শ সাজানো হয়েছে।
সন্তানের জন্য মা-বাবার প্রথম কাজ কী?
প্রথম কাজ হলো তার জন্য নিয়মিত দোয়া করা এবং তাকে আল্লাহর হাতে সঁপে দেওয়া। দোয়া শুধু কঠিন সময়ের জন্য নয়, প্রতিদিনের অভ্যাস হওয়া উচিত।
দোয়ার পাশাপাশি চেষ্টাও জরুরি। ইসলামে তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়, বরং চেষ্টা করে ফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া। কীভাবে দোয়া করবেন বা কোন দোয়া পড়বেন, তা নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছ থেকে জেনে নিন।
আমাদের নিজের আচরণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
শিশুরা উপদেশের চেয়ে বেশি শেখে মা-বাবাকে দেখে। আপনি যদি সন্তানকে মিথ্যা না বলতে বলেন, অথচ নিজে ফোনে বলেন “বাসায় নেই”, সে সেটাই শিখবে।
তাই কয়েকটি বিষয়ে নিজেকে যাচাই করুন।
- আমি কি সময়মতো নামাজ পড়ি?
- আমি কি বাড়িতে রাগের মাথায় চিৎকার করি?
- আমি কি প্রতিশ্রুতি রাখি?
- আমি কি পরিবারের সবার সামনে একে অপরের সাথে সম্মানের সাথে কথা বলি?
নিখুঁত হওয়া কেউ পারে না। ভুল হলে সন্তানের কাছে ক্ষমা চাওয়াও এক ধরনের শিক্ষা।
সন্তানকে সময় দেবেন কীভাবে?
সময়ের পরিমাণের চেয়ে মনোযোগের মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দিনে অন্তত কিছুক্ষণ ফোন সরিয়ে রেখে সন্তানের কথা শুনুন। তার স্কুল বা মাদরাসার গল্প জিজ্ঞেস করুন।
কয়েকটি সহজ অভ্যাস কাজে দেয়।
- একবেলা একসাথে খাওয়া।
- ঘুমানোর আগে ছোট কথোপকথন বা কুরআনের কিছু অংশ পড়া।
- সপ্তাহে একদিন পরিবারের সবার জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা।
এই ছোট সময়গুলোই সন্তানের সাথে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলে। যে সন্তান বাড়িতে কথা বলতে পারে, সে বাইরের ভুল পথে সহজে ঝোঁকে না।
কোমলতা ও শাসনের ভারসাম্য কেমন হবে?
শাসন ও স্নেহ দুটোই দরকার, তবে অতিরিক্ত কড়াকড়ি বা অতিরিক্ত ছাড়, দুটোই ক্ষতি করে। শাস্তির আগে বোঝানোর চেষ্টা করুন, কেন কাজটি ভুল। রাগের মাথায় শাস্তি দেবেন না।
সবার সামনে অপমান করবেন না। শিশুর সম্মানবোধ নষ্ট হলে সে একগুঁয়ে বা ভীতু হয়ে উঠতে পারে। ভালো কাজের প্রশংসা করুন; এটি ধমকের চেয়ে বেশি কার্যকর হয় বলে অনেক শিক্ষক অভিজ্ঞতা থেকে বলেন।
বাইরের প্রভাব সামলাব কীভাবে?
বন্ধু, মোবাইল, ইন্টারনেট, এসব আজ সন্তানের জীবনে বড় প্রভাব। সবকিছু নিষিদ্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। তার চেয়ে নিয়ম ঠিক করুন, কারণ বুঝিয়ে বলুন এবং নজর রাখুন।
সন্তানের বন্ধুদের চিনুন। তার ডিভাইসে কী দেখছে সে সম্পর্কে খোঁজ নিন। এ বিষয়ে আলাদা লেখা আছে: শিশুর স্ক্রিন-সময়: অভিভাবকের করণীয়। শিক্ষক ও মাদরাসার সাথেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন।
একটি সাধারণ পরিস্থিতি
এক মা সন্তানকে মাদরাসায় পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন যে "এবার সব দায়িত্ব মাদরাসার।" কয়েক মাস পর সন্তান বাড়িতে এসে পড়ায় মন দিত না। মা তখন বুঝলেন, মাদরাসা ও বাড়ি দুই জায়গায় সহযোগিতা চাই। তিনি প্রতি সপ্তাহে ছেলের সাথে পড়ার কথা বলতে শুরু করলেন, শিক্ষকের সাথে মাঝে মাঝে যোগাযোগ রাখলেন। ছেলের মনোযোগ ফিরে এল।
শুরু করবেন কীভাবে?
- সঠিক মাদরাসা বাছুন: পরিবেশ, শিক্ষক ও নিরাপত্তা দেখে সিদ্ধান্ত নিন।
- নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন: শিক্ষকের সাথে ভদ্রভাবে কথা বলুন।
- বাড়িতে সহায়ক পরিবেশ দিন: পড়ার সময় ও আদবের অভ্যাস।
- ধৈর্য ধরুন: ফল আসতে সময় লাগে।
- সন্তানের জন্য দু'আ করুন: নিয়মিত ও আন্তরিকভাবে।
মাদরাসা বাছাইয়ের জন্য সন্তানের জন্য মাদরাসা বাছাই এবং যোগাযোগের জন্য অভিভাবক-শিক্ষক যোগাযোগ দেখুন।
সাধারণ ভুল ও সমাধান
| ভুল | সমাধান |
|---|---|
| সব দায়িত্ব মাদরাসার ওপর চাপানো | বাড়িতেও সহযোগিতা করুন |
| সন্তানের সামনে শিক্ষকের সমালোচনা | আলাদাভাবে শিক্ষকের সাথে কথা বলুন |
| অন্যের সন্তানের সাথে তুলনা | সন্তানের নিজস্ব অগ্রগতি দেখুন |
| সন্তানের কষ্ট না শোনা | নিয়মিত শান্তভাবে শুনুন |
অভিভাবকের চেকলিস্ট
- সন্তান কী পড়ছে, তা কি আমি জানি?
- সপ্তাহে একবার তার সাথে মন খুলে কথা বলেছি কি?
- শিক্ষকের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম আছে কি?
- সন্তানের স্বাস্থ্য ও ঘুমের দিকে নজর দিয়েছি কি?
- তার জন্য দু'আ করেছি কি?
মোবাইল ও সঙ্গ নিয়ে সতর্কতা
সন্তানের মোবাইল ব্যবহারের সময় ও বিষয়ে ভদ্র কিন্তু দৃঢ় নিয়ম রাখুন। কারা তার বন্ধু, সে কোথায় সময় কাটায়, তা আন্তরিকভাবে জানুন, গোয়েন্দাগিরি না করে। বিস্তারিত দেখুন শিশুদের স্ক্রিন টাইম লেখায়।
হিদায়াতের সাথে প্রত্যাশা
সন্তান আলেম হবে, হাফেজ হবে বা অন্য পথে যাবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার সামর্থ্য ও আগ্রহ বুঝুন। জোর করে চাপিয়ে দিলে ফল উল্টো হতে পারে। দ্বীনের পথে তাকে ভালোবাসার সাথে এগিয়ে নিন। কখন হিফজ শুরু করা ভালো, তা জানতে কখন হিফজ শুরু করবেন লেখাটি দেখতে পারেন।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে
এই বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের একটি করে নির্দেশনা দেখা যায়।
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ قُوٓا۟ أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًۭا وَقُودُهَا ٱلنَّاسُ وَٱلْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَٰٓئِكَةٌ غِلَاظٌۭ شِدَادٌۭ لَّا يَعْصُونَ ٱللَّهَ مَآ أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ। তারা আল্লাহ তা’আলা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে।
সূরা তাহরীম, আয়াত ৬৬:৬পরিবারের দায়িত্ব শুধু খাওয়া-পরায় নয়, সন্তানের দ্বীন ও চরিত্র গড়াতেও। সন্তানের পড়াশোনা ও সঙ্গ নিয়ে অভিভাবকের খোঁজ রাখা এর অংশ।
كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ، فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ، كَمَثَلِ الْبَهِيمَةِ تُنْتَجُ الْبَهِيمَةَ، هَلْ تَرَى فِيهَا جَدْعَاءَ
ভাবার্থ: প্রতিটি শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মায়; তার বাবা-মা তাকে গড়ে তোলে।
সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩৮৫সন্তান ভালোর ওপর জন্মায়, এরপর ঘর ও পরিবেশ তাকে গড়ে তোলে। তাই বাড়ি ও মাদরাসা মিলে কাজ করলে ফল ভালো হয়।
সংক্ষেপে করণীয়
- প্রতিদিন সন্তানের জন্য দোয়া করুন, পাশাপাশি চেষ্টা চালিয়ে যান।
- নিজের কথা ও কাজে মিল রেখে সন্তানের সামনে উদাহরণ হোন।
- প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ফোন ছাড়া সন্তানের কথা শুনুন।
- রাগের সময় শাস্তি দেবেন না; বুঝিয়ে সংশোধনের পথ নিন।
- সন্তানের বন্ধু, ডিভাইস ও শিক্ষকের সাথে যোগাযোগের বিষয়ে সচেতন থাকুন।
প্রশ্নোত্তর
সন্তান কথা না শুনলে কী করব?
আগে কারণ বোঝার চেষ্টা করুন। ক্লান্তি, ভয়, বন্ধুর প্রভাব বা মনোযোগের অভাব, যে কোনোটি হতে পারে। শান্ত পরিবেশে স্পষ্ট নিয়ম বলুন এবং ধারাবাহিক থাকুন।
সন্তানকে দ্বীনের দিকে আনতে জোর করা কি ঠিক?
জোর করে সাময়িক ফল মিললেও দীর্ঘমেয়াদে আগ্রহ কমে যেতে পারে। ভালোবাসা, দৃষ্টান্ত ও উপযুক্ত পরিবেশ বেশি কার্যকর। ফিকহী নির্দেশনা প্রয়োজন হলে আলেমের পরামর্শ নিন।
মা-বাবার মধ্যে মতভেদ হলে সন্তানের কী হয়?
সন্তানের সামনে প্রকাশ্য বিবাদ তাকে বিভ্রান্ত করে। আড়ালে আলোচনা করে একই নীতিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন।
কিশোর সন্তান দূরে সরে গেলে কী করব?
চাপ না দিয়ে শোনার চেষ্টা করুন। তার আগ্রহের বিষয়ে কৌতূহল দেখান এবং প্রয়োজনে বিশ্বস্ত শিক্ষক বা আত্মীয়ের সাহায্য নিন।
এই লেখা পরিষদের সম্পাদনা পরিষদের পক্ষ থেকে সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য। ফিকহী বা আইনগত বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
