মা-বাবার সেবা ও হক: সন্তানের দায়িত্ব
৬ নভেম্বর ২০২৬ · ৬ মিনিটে পড়া · জমিরিয়া তা'লিম ও তায্কিয়া পরিষদ
মা-বাবার সেবা ও তাঁদের হক আদায় ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এর মূল কথা: তাঁদের সাথে সম্মান ও নম্রতার সাথে কথা বলা, প্রয়োজনে সাহায্য করা, তাঁদের জন্য দোয়া করা এবং বৈধ বিষয়ে তাঁদের কথা মেনে চলা। কুরআনে আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশের পাশেই মা-বাবার সাথে সদাচরণের কথা এসেছে; আয়াতের ব্যাখ্যা নির্ভরযোগ্য তাফসীরে দেখে নিন।
মা-বাবার প্রতি সন্তানের মৌলিক দায়িত্ব কী কী?
আলেমগণের সাধারণ আলোচনা অনুযায়ী মা-বাবার প্রতি দায়িত্বকে এভাবে সাজানো যায়:
- সম্মান ও নম্র কথা: কণ্ঠস্বর উঁচু না করা, বিরক্তি প্রকাশ না করা, অসম্মানজনক শব্দ ব্যবহার না করা।
- সেবা ও সহযোগিতা: শারীরিক সাহায্য, ওষুধ-পথ্য ও প্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যবস্থা।
- আর্থিক সহায়তা: সামর্থ্য থাকলে প্রয়োজনে সাহায্য করা। কতটুকু দায়িত্ব, তা মুফতির কাছে জেনে নিন।
- দোয়া: জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় তাঁদের জন্য দোয়া করা।
- সম্পর্ক রক্ষা: তাঁদের আত্মীয়-বন্ধুদের সাথেও ভালো সম্পর্ক রাখা।
- বৈধ বিষয়ে আনুগত্য: আল্লাহর অবাধ্যতা না হলে তাঁদের কথা মানা।
সম্মান ও নম্রতা কীভাবে প্রকাশ করব?
বার্ধক্যে মানুষ আবেগপ্রবণ ও সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। তাই আচরণে সতর্ক থাকা ভালো:
- তাঁরা কথা বললে মনোযোগ দিয়ে শোনা।
- একই কথা বারবার বললেও ধৈর্য ধরা।
- মতের অমিল হলে নরম ভাষায় যুক্তি দেওয়া, তর্কে না জড়ানো।
- তাঁদের সামনে মোবাইল বা অন্য কাজে ব্যস্ত না থাকা।
- নিয়মিত খোঁজ নেওয়া ও সালাম দেওয়া।
- ছোট উপহার বা খাবার নিয়ে যাওয়া।
দূরে থাকা ছাত্র কীভাবে মা-বাবার হক আদায় করবে?
অনেক তালিবে ইলম আবাসিক মাদরাসায় বাড়ির বাইরে থাকে। দূরে থেকেও মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন সম্ভব:
- যোগাযোগ রাখা: মাদরাসার নিয়ম মেনে নিয়মিত খোঁজ ও সালাম পাঠানো।
- পড়াশোনায় মনোযোগ: মা-বাবা কষ্ট করে পড়াচ্ছেন, তাই ভালোভাবে পড়া ও চরিত্র গঠন করাই বড় প্রতিদান।
- অনর্থক খরচ এড়ানো: তাঁদের দেওয়া অর্থ আমানত ভেবে সাবধানে খরচ করা।
- দোয়া: নিয়মিত তাঁদের জন্য দোয়া করা।
- ছুটিতে সেবা: বাড়ি গেলে ঘরের কাজে সাহায্য করা এবং তাঁদের সময় দেওয়া।
- সততা: মা-বাবাকে মাদরাসা ও নিজের অবস্থা সম্পর্কে সত্য জানানো।
বার্ধক্যে মা-বাবার যত্ন কেমন হবে?
বার্ধক্য আসে দুর্বলতা ও অসুস্থতা নিয়ে। এ সময় সন্তানের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ:
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ওষুধের ব্যবস্থা।
- সম্ভব হলে তাঁদের সঙ্গে সময় কাটানো, একাকিত্ব দূর করা।
- তাঁদের পছন্দ ও প্রয়োজনের কথা শোনা।
- একাধিক ভাইবোন থাকলে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং পরস্পরের প্রতি ক্ষোভ না রাখা।
- তাঁদের সেবার ক্ষেত্রে ধৈর্য ও সহনশীলতা।
বিশেষ পরিস্থিতিতে, যেমন মা-বাবার দ্বন্দ্ব বা তাঁদের সাথে মতবিরোধে কী করণীয়, তা নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে জেনে নিন।
মা-বাবা অন্যায় আদেশ দিলে কী করব?
বৈধ বিষয়ে মা-বাবার আনুগত্য জরুরি। তবে আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে আনুগত্য নেই, এটি আলেমদের সাধারণ নীতি। এমন ক্ষেত্রেও অসম্মান না করে নম্রভাবে অপারগতা জানানো উচিত। সূক্ষ্ম ও জটিল পরিস্থিতির জন্য মুফতির পরামর্শ নিন।
মা-বাবা মারা গেলে সন্তানের করণীয়
তাঁদের মৃত্যুর পরেও সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয় না। সাধারণভাবে বলা হয়:
- নিয়মিত তাঁদের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার।
- তাঁদের ঋণ বা ওসিয়ত থাকলে নির্ভরযোগ্য মুফতির পরামর্শে তা আদায়।
- তাঁদের নামে সামর্থ্য অনুযায়ী সদাকা বা ভালো কাজ।
- তাঁদের আত্মীয় ও বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক।
সদাকা ও ওসিয়তের শরয়ী বিধান মুফতির কাছে জেনে নেওয়া উচিত।
শুরু করবেন কীভাবে?
বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান কেবল বড় কাজে নয়, প্রতিদিনের ছোট আচরণে প্রকাশ পায়। প্রথমে ভাবুন, গত সপ্তাহে তাঁদের সাথে কতবার সময় কাটিয়েছেন এবং কতবার ধৈর্য ধরেছেন।
- প্রতিদিন অন্তত একবার তাঁদের খোঁজ নিন, সামনে না থাকলে ফোনে।
- তাঁদের কথা মন দিয়ে শুনুন, বাধা দেবেন না।
- কঠিন কথাও নরম স্বরে বলুন।
- তাঁদের প্রয়োজন, যেমন ওষুধ বা বাজার, নিজে থেকেই খেয়াল রাখুন।
- তাঁদের জন্য নিয়মিত দু'আ করুন।
একটি সাধারণ দৃশ্য
এক তরুণ হোস্টেলে থাকে। পড়ার চাপে সে মাসের পর মাস বাড়িতে ঠিকমতো ফোন করত না। একদিন মা অসুস্থ হলে সে বুঝল, তাঁর অপেক্ষা কত গভীর। এরপর সে প্রতিদিন রাতে কয়েক মিনিট কথা বলার অভ্যাস গড়ল। মা-ও নিশ্চিন্ত হলেন, আর তরুণের মনেও শান্তি এল। সম্পর্ক টেকে নিয়মিত যোগাযোগে।
সাধারণ ভুল ও সমাধান
| ভুল | সমাধান |
|---|---|
| বিরক্ত হয়ে উঁচু স্বরে কথা বলা | থেমে নরম ভাষায় বলুন |
| তাঁদের মতামত পুরনো ভেবে এড়িয়ে যাওয়া | অভিজ্ঞতার মূল্য দিন |
| ব্যস্ততার অজুহাতে দূরে থাকা | অল্প হলেও নিয়মিত সময় দিন |
| তাঁদের সামনে অন্যের কাছে অভিযোগ | মতভেদ থাকলে একান্তে ভদ্রভাবে বলুন |
একজন তালিবে ইলমের জন্য বিশেষ কথা
দূরে পড়তে থাকা তালিবে ইলম বাবা-মায়ের ত্যাগ স্মরণে রাখুন। তাঁদের স্বপ্ন ও কষ্টের কথা ভাবলে পড়ায় মনোযোগ বাড়ে। ছুটিতে বাড়ি গেলে ঘরের কাজে সাহায্য করুন।
যদি মতভেদ থাকে
বাবা-মায়ের সাথে কখনও কখনও মতের অমিল হতে পারে। এমন সময় তর্কে না গিয়ে সম্মানের সাথে নিজের কথা বলুন এবং প্রয়োজনে পরিবারের কোনো বিজ্ঞ আত্মীয় বা আলেমের মধ্যস্থতা নিন। শরিয়তের সীমা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে জানুন।
আদব শিক্ষার জন্য সন্তানকে আদব শেখানো এবং কৃতজ্ঞতার জন্য শিক্ষকের প্রতি কৃতজ্ঞতা লেখা দুটি পড়তে পারেন।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে
এই বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের একটি করে নির্দেশনা দেখা যায়।
لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِى رَسُولِ ٱللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌۭ لِّمَن كَانَ يَرْجُوا۟ ٱللَّهَ وَٱلْيَوْمَ ٱلْءَاخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرًۭا
যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।
সূরা আহযাব, আয়াত ৩৩:২১আদর্শ চরিত্রের মাপকাঠি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন। ছোট ছোট আচরণে তাঁর অনুসরণই তাযকিয়ার বাস্তব পথ।
خِيَارُكُمْ أَحَاسِنُكُمْ أَخْلاَقًا . وَلَمْ يَكُنِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَاحِشًا وَلاَ مُتَفَحِّشًا . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ
ভাবার্থ: কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে প্রিয় ও নিকটে থাকবে তোমাদের মধ্যে যারা সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী।
জামে তিরমিযী, হাদীস নং ১৯৭৫ (আলবানীর মতে সহীহ)ভালো চরিত্র আখিরাতে নৈকট্যের কারণ। আখলাক শুধু জানার বিষয় নয়, রোজকার আচরণে চর্চা করার বিষয়।
সংক্ষেপে করণীয়
- মা-বাবার সাথে নম্রভাবে কথা বলুন এবং ধৈর্য ধরুন।
- নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন, বিশেষ করে দূরে থাকলে।
- সামর্থ্য অনুযায়ী সেবা ও সহায়তা করুন।
- প্রতিদিন তাঁদের জন্য দোয়া করুন।
- জটিল বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন।
প্রশ্নোত্তর
মা-বাবার সাথে মতের অমিল হলে কী করব?
নম্র ভাষায় নিজের কথা বলুন, তর্ক ও উচ্চস্বর এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে পরিবারের অভিজ্ঞ কাউকে মধ্যস্থতায় রাখুন।
মা-বাবা অমুসলিম বা দ্বীন থেকে দূরে হলে?
এ ক্ষেত্রেও ভদ্র ও সদাচরণের নির্দেশ আছে বলে আলেমগণ উল্লেখ করেন। বিস্তারিত বিধান নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে জেনে নিন।
আমি ব্যস্ত ছাত্র, মা-বাবাকে সময় দিতে পারি না, কী করব?
কিছু সময় বের করে ফোনে খোঁজ নিন এবং ছুটিতে তাঁদের সময় দিন। পড়াশোনা ভালোভাবে সম্পন্ন করাও তাঁদের প্রতি দায়িত্ব পালনের অংশ।
মায়ের হক ও বাবার হকে কি পার্থক্য আছে?
উভয়ের হক গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের বিশেষ মর্যাদার কথা হাদীসে এসেছে বলে আলেমগণ উল্লেখ করেন। সুনির্দিষ্ট বর্ণনা নির্ভরযোগ্য উৎসে দেখে নিন।
এই লেখা পরিষদের সম্পাদনা পরিষদের পক্ষ থেকে সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য। ফিকহী বা আইনগত বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
