সবর ও শোকর: জীবনের দুই ডানা
৬ নভেম্বর ২০২৬ · ৬ মিনিটে পড়া · জমিরিয়া তা'লিম ও তায্কিয়া পরিষদ
সবর মানে কষ্ট, অভাব বা পরীক্ষার সময় অস্থির না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ধৈর্য ধরা এবং ন্যায়সংগত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। শোকর মানে প্রাপ্ত নেয়ামতের জন্য অন্তরে, মুখে ও কাজে কৃতজ্ঞ থাকা। মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় ভারসাম্য এই দুই গুণ: বিপদে সবর, সুখে শোকর।
সবর বলতে কী বোঝায়?
সবর মানে নিষ্ক্রিয় বসে থাকা নয়। সবরের অর্থ হলো নিজেকে ধরে রাখা: রাগে কিছু বলে না ফেলা, হতাশায় ভেঙে না পড়া এবং হারাম পথে সমাধান না খোঁজা। একই সাথে বৈধ ও ন্যায়সংগত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
আলেমগণ সাধারণত সবরকে তিনটি ক্ষেত্রে ভাগ করেন:
- আনুগত্যে সবর: নামাজ, পড়াশোনা ও দায়িত্ব পালনে নিয়মিত থাকা, যদিও কষ্ট বা ক্লান্তি লাগে।
- গুনাহ থেকে বাঁচতে সবর: মন চাইলেও নিষিদ্ধ কাজ থেকে নিজেকে সামলে রাখা।
- বিপদে সবর: অসুস্থতা, অভাব বা ক্ষতির সময় অভিযোগ ও অস্থিরতা থেকে বিরত থাকা।
কুরআনে সবরকারীদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ সাহচর্যের কথা এসেছে। এ বিষয়ে আয়াতের ব্যাখ্যা নির্ভরযোগ্য তাফসীরে দেখে নিন।
শোকর বলতে কী বোঝায়?
শোকর হলো নেয়ামতকে আল্লাহর দান বলে চেনা এবং সেটি তাঁর পছন্দের পথে ব্যবহার করা। শোকরের তিনটি দিক সাধারণত আলোচনা করা হয়:
- অন্তরে স্বীকার করা: এই সুস্থতা, বিদ্যা বা সুযোগ আমার নিজের কৃতিত্ব নয়, আল্লাহর দান।
- মুখে প্রকাশ করা: আলহামদুলিল্লাহ বলা এবং কৃতজ্ঞ ভাষা ব্যবহার করা।
- কাজে প্রমাণ করা: নেয়ামতকে ভালো কাজে লাগানো, যেমন শিক্ষা পেয়ে অন্যকে শেখানো।
মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতাও শোকরের অংশ। যে উস্তাদ আমাকে শিখিয়েছেন, যে মা-বাবা কষ্ট করে পড়িয়েছেন, তাঁদের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা ও দোয়া করা ভালো চরিত্রের পরিচয়।
ছাত্রজীবনে সবর কেন এত দরকার?
ইলম অর্জন ধীরে হয়। আজ পড়ে কালই পাণ্ডিত্য আসে না। হিফজ, আরবি ব্যাকরণ বা কঠিন কিতাব বুঝতে সময় লাগে, মাঝে মাঝে মন ভেঙে যায়। এ সময় সবর ছাত্রকে টিকিয়ে রাখে।
ছাত্ররা যেভাবে সবরের চর্চা করতে পারে:
- কঠিন পাঠ একদিনে শেষ করার চাপ না নিয়ে ছোট ছোট ভাগে পড়া।
- ফল খারাপ হলে নিজেকে দোষারোপ করে বসে না থেকে কারণ খুঁজে সংশোধন করা।
- উস্তাদের ধমক বা সংশোধনকে সহজভাবে নেওয়া এবং ভুল শোধরানো।
- সহপাঠীর ভালো ফল দেখে অধৈর্য ও হিংসা না করা।
শোকরের চর্চা কীভাবে করা যায়?
শোকর অভ্যাসের বিষয়। যাঁরা প্রতিদিন নেয়ামতের কথা মনে করেন, তাঁদের অন্তর তুলনামূলক শান্ত থাকে। কিছু সহজ উপায়:
- সকালে ও রাতে সুস্থতা, খাবার, পড়ার সুযোগের জন্য আলহামদুলিল্লাহ বলা।
- যাঁর কাছ থেকে উপকার পেয়েছেন, তাঁকে ধন্যবাদ ও দোয়া জানানো।
- নিজের চেয়ে ধনী বা সুবিধাপ্রাপ্তদের দিকে না তাকিয়ে, যাদের সুযোগ কম তাদের দিকে তাকিয়ে নিজের নেয়ামত স্মরণ করা।
- খাবার, বই, বিদ্যুৎ ও সময় অপচয় না করা।
- সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু দান করা বা অন্যের সহায়তা করা।
সবর ও শোকর একসাথে কীভাবে চলে?
জীবনে সুখ-দুঃখ পালা করে আসে। দুঃখে সবর না থাকলে মানুষ অভিযোগে ভেঙে পড়ে, আর সুখে শোকর না থাকলে অহংকার ও গাফলতি আসে। তাই দুটি একসাথে থাকলে মানুষ ভারসাম্যে থাকে। কেউ দরিদ্র মাদরাসায় পড়ায়, অভাবের মাঝেও ধৈর্য ধরে কাজ করে, আবার যেটুকু পায় তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকে, এটাই দুই গুণের বাস্তব উদাহরণ।
তবে সবর মানে অন্যায় মেনে নেওয়া নয়। অন্যায় বা হকনষ্টের ক্ষেত্রে বৈধ ও শান্ত পথে প্রতিকার চাওয়া সবরের পরিপন্থী নয়। কীভাবে করা উচিত, সে বিষয়ে প্রয়োজনে আলেম ও অভিজ্ঞ মুরব্বির পরামর্শ নিন।
প্রতিদিনের জীবনে সবর ও শোকরের চর্চা
নিচের ছোট অভ্যাসগুলো দিয়ে শুরু করা যায়।
| পরিস্থিতি | সবরের চর্চা | শোকরের চর্চা |
|---|---|---|
| কঠিন পড়া | ধীরে ধীরে চালিয়ে যাওয়া | বুদ্ধি ও সুযোগের জন্য কৃতজ্ঞতা |
| কারো কটু কথা | প্রতিক্রিয়া সংযত রাখা | ভালো সঙ্গের জন্য কৃতজ্ঞতা |
| সামান্য ঘাটতি | অভিযোগ না করা | যা আছে তা স্মরণ করা |
| সফলতা | অহংকার এড়ানো | আল্লাহর অনুগ্রহ স্বীকার |
একটি সাধারণ দৃশ্যপট
এক ছাত্র পরীক্ষায় প্রত্যাশার চেয়ে কম নম্বর পেল। প্রথমে সে হতাশ হলো, এমনকি পড়া ছেড়ে দিতে চাইল। শিক্ষক তাকে বললেন, ফলাফলে ধৈর্য ধরো, কোথায় ভুল হয়েছিল খুঁজে বের করো, আর যে সুযোগ পেয়েছ তার জন্য শোকর করো। পরের বার সে নিজের পদ্ধতি বদলে নিল।
সাধারণ ভুল ও সংশোধন
- ভুল: সবর মানে চুপ করে অন্যায় সয়ে যাওয়া। সংশোধন: সবর মানে সংযম ও প্রচেষ্টা; প্রয়োজনে ন্যায্য পথে প্রতিকার চাওয়া যায়।
- ভুল: শোকর শুধু মুখে বলা। সংশোধন: নিয়ামতকে সঠিক কাজে লাগানোও শোকর।
- ভুল: অন্যের সাথে তুলনা। সংশোধন: এ থেকে হিংসা জন্মায়।
শুরু করবেন কীভাবে?
প্রতি রাতে ঘুমের আগে তিনটি নিয়ামতের কথা ভাবুন। কঠিন কিছু ঘটলে প্রথমে থেমে নিঃশ্বাস নিন, তারপর কাজ করুন। তাওবা ও ইস্তিগফার লেখাটিও এই চর্চায় সহায়ক।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে
এই বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের একটি করে নির্দেশনা দেখা যায়।
لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِى رَسُولِ ٱللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌۭ لِّمَن كَانَ يَرْجُوا۟ ٱللَّهَ وَٱلْيَوْمَ ٱلْءَاخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرًۭا
যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।
সূরা আহযাব, আয়াত ৩৩:২১আদর্শ চরিত্রের মাপকাঠি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন। ছোট ছোট আচরণে তাঁর অনুসরণই তাযকিয়ার বাস্তব পথ।
خِيَارُكُمْ أَحَاسِنُكُمْ أَخْلاَقًا . وَلَمْ يَكُنِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَاحِشًا وَلاَ مُتَفَحِّشًا . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ
ভাবার্থ: কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে প্রিয় ও নিকটে থাকবে তোমাদের মধ্যে যারা সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী।
জামে তিরমিযী, হাদীস নং ১৯৭৫ (আলবানীর মতে সহীহ)ভালো চরিত্র আখিরাতে নৈকট্যের কারণ। আখলাক শুধু জানার বিষয় নয়, রোজকার আচরণে চর্চা করার বিষয়।
সংক্ষেপে করণীয়
- কঠিন সময়ে অভিযোগ কমিয়ে দোয়া ও বৈধ চেষ্টা বাড়ান।
- প্রতিদিন অন্তত তিনটি নেয়ামতের কথা স্মরণ করে আলহামদুলিল্লাহ বলুন।
- রাগ উঠলে কথা বলার আগে থামুন, প্রয়োজনে স্থান বদলান।
- যাঁদের কাছ থেকে উপকার পেয়েছেন, তাঁদের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন।
- নেয়ামত অপচয় না করে ভালো কাজে লাগান।
প্রশ্নোত্তর
কষ্টে কেঁদে ফেললে কি সবর ভেঙে যায়?
কান্না মানবীয় স্বাভাবিকতা এবং এটি সবরের পরিপন্থী নয়। সবর ভাঙে যখন মানুষ অধৈর্য হয়ে আল্লাহর ফয়সালা নিয়ে অভিযোগ করে বা নিষিদ্ধ পথে যায়। বিস্তারিত জানতে আলেমের পরামর্শ নিন।
অভাবে থেকে কীভাবে শোকর করব?
যা আছে তা দেখুন: সুস্থতা, ঈমান, পরিবার, শেখার সুযোগ। অভাব দূর করার বৈধ চেষ্টা চালিয়ে যান এবং একই সাথে বর্তমান নেয়ামতের মূল্য বুঝুন।
সবর কি শেখা যায়?
হ্যাঁ, সবর চর্চার মাধ্যমে বাড়ে। ছোট ছোট বিষয়ে নিজেকে সামলানোর অভ্যাস করলে বড় পরীক্ষায় সহজ হয়। সৎ সঙ্গ ও দোয়াও সাহায্য করে।
ছোট শিশুদের সবর ও শোকর কীভাবে শেখাব?
শিশুরা উপদেশের চেয়ে অনুকরণে শেখে। বাবা-মা ও শিক্ষক নিজে যদি ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞ হন, শিশুরাও তা শিখবে। খাওয়ার পর আলহামদুলিল্লাহ বলা ও ছোট উপহারে ধন্যবাদ বলার অভ্যাস করানো যায়।
এই লেখা পরিষদের সম্পাদনা পরিষদের পক্ষ থেকে সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য। ফিকহী বা আইনগত বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
