তাফসীর কেন পড়ানো হয়
৬ নভেম্বর ২০২৬ · ৫ মিনিটে পড়া · জমিরিয়া তা'লিম ও তায্কিয়া পরিষদ
তাফসীর পড়ানো হয় যাতে কুরআনের অর্থ, প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা নির্ভরযোগ্য ধারায় বোঝা যায়। শুধু তিলাওয়াত করলে সওয়াব ও বরকতের বিষয় থাকে, কিন্তু কুরআনের নির্দেশ জীবনে মানতে হলে অর্থ ও ব্যাখ্যা জানা দরকার। মাদরাসার নিসাবে তাই তিলাওয়াত ও তাজবীদের পাশাপাশি ধাপে ধাপে তরজমা ও তাফসীর রাখা হয়।
তাফসীর কী এবং তিলাওয়াতের সাথে এর পার্থক্য কী?
তাফসীর হলো কুরআনের আয়াতের অর্থ ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করার জ্ঞান। তিলাওয়াত হলো সঠিক উচ্চারণে কুরআন পড়া। দুটি আলাদা কিন্তু একে অপরের পরিপূরক।
কুরআন আল্লাহর কালাম। এর ব্যাখ্যা যে কেউ নিজের মতো করে করতে পারে না, কারণ এতে ভাষা, শানে নুযূল, পূর্বাপর প্রসঙ্গ এবং নবীজি ও সাহাবীদের বোঝাপড়ার বিষয় জড়িত। আহলুস সুন্নাহর ধারায় তাফসীর শেখা হয় নির্ভরযোগ্য ওস্তাদের তত্ত্বাবধানে। কোনো আয়াতের বিশেষ ব্যাখ্যা বা মাসআলার জন্য অভিজ্ঞ আলেমের কাছে যাওয়াই নিরাপদ।
তাফসীর পড়ে একজন তালিবে ইলম কী লাভ করে?
- কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক। অর্থ বুঝে পড়লে তিলাওয়াতে মনোযোগ বাড়ে।
- আয়াতের সঠিক প্রয়োগ বোঝা। কোন কথা কোন প্রেক্ষাপটে এসেছে, তা না জানলে ভুল বোঝার আশঙ্কা থাকে।
- ফিকহ ও আকীদার ভিত। ফিকহী মাসআলা ও আকীদার আলোচনায় কুরআনের নির্দেশ বুঝতে তাফসীরের জ্ঞান লাগে।
- দাওয়াত ও নসীহতের যোগ্যতা। ভবিষ্যতে ইমাম, শিক্ষক বা বক্তা হলে সঠিক ভিত্তিতে কথা বলতে পারা।
- আত্মশুদ্ধি। কুরআনের উপদেশ নিয়ে চিন্তা করলে মন নরম হয় এবং আমলের আগ্রহ বাড়ে।
নিসাবে তাফসীর কোন ধাপে আসে?
পরিষদের পাঠ্যসূচি অনুযায়ী প্রথম দিকে জোর থাকে কুরআন পড়া, তাজবীদ ও সূরা মুখস্থে। নূরানী ও ইবতিদাইয়্যাহ স্তরে আছে আম পারা, ফাযায়েলে সূরা এবং ৩০ পারা কুরআন মাজীদ।
এরপর ধাপগুলো এভাবে এগোয়:
- ছানাবিয়্যাহ আম্মাহ, দ্বিতীয় বছর (১০ম): বিষয়তালিকায় তাফসীর যুক্ত হয় এবং কিতাবের তালিকায় আছে "তরজমায়ে কোরআন"।
- ছানাবিয়্যাহ খাসসাহ (১১শ ও ১২শ): তাফসীর বিষয় চলতে থাকে।
- ফযীলাহ ২য় বর্ষ (১৪শ): তাফসীর ও উসূলে তাফসীর বিষয় এবং "জালালাইন" (১ম ও ২য়) কিতাব আছে। সাথে আছে "আল ফাওযুল কাবীর"।
- তাকমীল, দাওরায়ে হাদীস: বিষয়তালিকায় তাফসীরও আছে।
পুরো তালিকা পাঠ্যসূচি পাতায় দেখা যাবে। নিসাবের সামগ্রিক কাঠামো বুঝতে ১৫ বছরের নিসাব: এক নজরে লেখাটি কাজে আসবে।
কেন তাফসীর আগে নয়, কয়েক বছর পরে?
এর প্রধান কারণ ভাষার প্রস্তুতি। কুরআনের তাফসীরের কিতাব আরবি ভাষায়। তাই আগে নাহু, সরফ, আরবি সাহিত্য ও শব্দভাণ্ডার শেখা দরকার। আরবি ভাষাশিক্ষা নিয়ে আলাদা আলোচনা পাবেন আরবি ভাষা শেখানোর আধুনিক কৌশল লেখায়।
তরজমা ও তাফসীর একই জিনিস নয়। তরজমা হলো সহজ অর্থ; তাফসীর হলো ব্যাখ্যা, প্রেক্ষাপট ও শিক্ষার বিস্তারিত আলোচনা। এই ধাপে ধাপে এগোনোর কারণে ছাত্র প্রথমে ভাষা ও মূল পাঠে দক্ষ হয়, তারপর গভীর ব্যাখ্যায় প্রবেশ করে।
তাফসীর পড়তে হাদীসের সাহায্যও লাগে। অনেক আয়াতের ব্যাখ্যা নবীজির বাণী ও আমলের আলোকে বোঝা যায়, তাই তাফসীর ও হাদীস পাশাপাশি চলে। এ বিষয়ে হাদীস কেন পড়ানো হয় লেখাটি পড়তে পারেন।
অভিভাবক কীভাবে সন্তানের তাফসীর শিক্ষায় সাহায্য করবেন?
ঘরে সন্তানের তিলাওয়াতের পরিবেশ রাখুন। তাকে অর্থ নিয়ে প্রশ্ন করতে দিন, আর সব উত্তর না জানলে ওস্তাদের কাছে জিজ্ঞেস করতে বলুন। ইন্টারনেট থেকে পাওয়া যে কোনো ব্যাখ্যা যাচাই না করে গ্রহণ করা ঠিক নয়। নিজেও সময় বের করে সন্তানের সাথে সহজ বাংলা তরজমা থেকে পড়ার অভ্যাস করতে পারেন, তবে কোন তরজমা বা ব্যাখ্যাগ্রন্থ ভালো হবে তা জানতে শিক্ষকের পরামর্শ নিন।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে
এই বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের একটি করে নির্দেশনা দেখা যায়।
أَمَّنْ هُوَ قَٰنِتٌ ءَانَآءَ ٱلَّيْلِ سَاجِدًۭا وَقَآئِمًۭا يَحْذَرُ ٱلْءَاخِرَةَ وَيَرْجُوا۟ رَحْمَةَ رَبِّهِۦ ۗ قُلْ هَلْ يَسْتَوِى ٱلَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَٱلَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ ۗ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُو۟لُوا۟ ٱلْأَلْبَٰبِ
যে ব্যক্তি রাত্রিকালে সেজদার মাধ্যমে অথবা দাঁড়িয়ে এবাদত করে, পরকালের আশংকা রাখে এবং তার পালনকর্তার রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এরূপ করে না; বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।
সূরা যুমার, আয়াত ৩৯:৯ইলমের মর্যাদা বোঝাতে এই আয়াত বারবার পড়া হয়। যাঁরা শেখেন ও শেখান, তাঁদের প্রতি সম্মান ও যত্ন মাদরাসার পরিবেশের অংশ হওয়া উচিত।
… مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ إِلاَّ نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلاَئِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ وَمَنْ بَطَّأَ بِهِ عَمَلُهُ لَمْ يُسْرِعْ بِهِ نَسَبُهُ
ভাবার্থ: যে ব্যক্তি ইলম অর্জনের পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।
সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৯৯ইলম অর্জনের পথকে আল্লাহ জান্নাতের পথ সহজ করে দেন বলে জানানো হয়েছে। শিক্ষক ও তালিবে ইলম উভয়ের জন্য এটি বড় উৎসাহ।
সংক্ষেপে করণীয়
- তিলাওয়াত ও তাজবীদ শুদ্ধ করার দিকে শুরু থেকেই নজর দিন।
- অর্থ ও তাফসীর শেখার জন্য ভাষার ভিত মজবুত করতে সময় দিন।
- আয়াতের ব্যাখ্যায় তাড়াহুড়ো না করে নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে যান।
- সন্তানের প্রশ্নকে উৎসাহ দিন; ওস্তাদের সাথে যোগাযোগ রাখুন।
- নিসাবের ধাপ অনুযায়ী ধৈর্য রাখুন, কারণ গভীর তাফসীর পরের বছরগুলোতে আসে।
প্রশ্নোত্তর
তরজমা পড়লেই কি তাফসীর বোঝা হয়ে যায়?
না। তরজমা সাধারণ অর্থ জানায়, কিন্তু তাফসীরে প্রেক্ষাপট, শব্দের গভীর অর্থ ও শিক্ষার ব্যাখ্যা থাকে। তাই তরজমার পরও যোগ্য শিক্ষকের কাছে তাফসীর শেখা দরকার।
শুধু তিলাওয়াত করলে কি যথেষ্ট নয়?
তিলাওয়াতের নিজস্ব মর্যাদা আছে এবং তা অবশ্যই চালিয়ে যেতে হবে। তবে কুরআনের নির্দেশ মানতে হলে অর্থ বোঝাও জরুরি। দুটোই একসাথে চলা ভালো। কোন পর্যায়ে কী করণীয় তা আলেমদের কাছ থেকে জেনে নিন।
নিসাবে কোন কিতাবে তাফসীর পড়ানো হয়?
পাঠ্যসূচির তালিকায় আছে "তরজমায়ে কোরআন" (ছানাবিয়্যাহ আম্মাহ ২য় বর্ষ), "জালালাইন" (ফযীলাহ ২য় বর্ষ) এবং তাফসীর বিষয় আরও কয়েক স্তরে। সবসময় সর্বশেষ তালিকা পাঠ্যসূচি পাতায় দেখুন।
সন্তান তাফসীর ধরতে কঠিন মনে করলে কী করব?
এটি স্বাভাবিক, বিশেষত ভাষা দুর্বল থাকলে। শিক্ষকের সাথে কথা বলে তার দুর্বলতা কোথায় জানুন। অতিরিক্ত সময় ও সহজ ব্যাখ্যা দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়।
এই লেখা পরিষদের সম্পাদনা পরিষদের পক্ষ থেকে সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য। ফিকহী বা আইনগত বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
