পরিষদের লোগোজমিরিয়া তা'লিম ও তায্‌কিয়া পরিষদ বাংলাদেশঘরে ঘরে আলেম ও মুত্তাকী বান্দা, উন্নত হোক দেশের শিক্ষা

পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা ও লক্ষ্য

৬ নভেম্বর ২০২৬ · ৫ মিনিটে পড়া · জমিরিয়া তা'লিম ও তায্‌কিয়া পরিষদ

জমিরিয়া তা'লিম ও তায্‌কিয়া পরিষদ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন আল্লামা শাহ জমির উদ্দীন নানুপুরী (রহ.), ২০১০ সালের ৮ জুলাই, ৩৬ সদস্যের একটি কমিটি নিয়ে। এটি রাজনীতিমুক্ত একটি দ্বীনী শিক্ষা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। তাঁর ইন্তেকালের পর ২০১৪ সালের ১০ জুন পরিষদের নতুন কমিটি গঠিত হয়। বর্তমান চেয়ারম্যান আল্লামা শাহ ছালাহ্ উদ্দীন নানুপুরী। এই লেখায় পরিষদের শুরু ও লক্ষ্যগুলো সংক্ষেপে বলা হলো।

প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা শাহ জমির উদ্দীন নানুপুরী (রহ.)। তিনি জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুরের তৃতীয় মুহতামিম ছিলেন, ১৪০৬ থেকে ১৪৩২ হিজরী পর্যন্ত। পরিষদের নিজস্ব ভূমিকায় তাঁকে উম্মতের কান্ডারী, সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম ও আধ্যাত্মিক রাহবার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জামিয়ার ইতিহাস নিয়ে পড়তে পারেন জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর: ইতিহাসের সারকথা।

পরিষদ কীভাবে গঠিত হয়?

পরিষদের ভূমিকা অনুযায়ী, দ্বীনী শিক্ষা অর্থাৎ কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড মনে করে দ্বীনী জ্ঞান প্রচারের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠাতা ২০১০ সালের ৮ জুলাই ৩৬ জন দক্ষ ও বিজ্ঞ সদস্যের একটি কমিটির সমন্বয়ে এই শিক্ষা বোর্ড গঠন করেন। পরিষদের প্রধান কার্যালয় জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম।

২০১৪ সালের নতুন কমিটি কেন?

পরিষদের ভূমিকায় বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠাতার ইন্তেকালের পর তাঁর মিশনকে বেগবান করা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত বোর্ডের কার্যক্রম আরও এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ২০১৪ সালের ১০ জুন অভিজ্ঞ ও সুদক্ষ সদস্যদের সমন্বয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা প্রতিষ্ঠাতার স্বপ্ন ও প্রেরণা বাস্তবায়নে একতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার কথা জানিয়েছেন।

পরিষদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী?

পরিষদ চারটি লক্ষ্য সামনে রেখে গঠিত:

  1. প্রতিটি মুসলিম পরিবারের দোরগোড়ায় দ্বীনী শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া এবং ঈমান-আমলের পরিবেশ গড়ে তোলা।
  2. শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় জ্ঞান লাভের জন্য অপরিহার্য বিষয়গুলো শেখানো।
  3. পূর্ণাঙ্গ সুন্নাতে নববীর অনুসারী হিসেবে আদর্শ মানুষ তৈরি করা।
  4. বিজাতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতিমুক্ত একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তোলা, যারা সাহাবায়ে কেরামের গুণাবলীতে গুণান্বিত হবে এবং সমাজের সর্বস্তরে দ্বীন কায়েমের চেষ্টা করবে।

এই লক্ষ্যগুলো পরিষদের নিজস্ব ভাষ্য থেকে নেওয়া সারকথা। আরও মূল নীতি পাবেন পরিষদের গঠনতন্ত্রে।

রাজনীতিমুক্ত থাকার অর্থ কী?

পরিষদ নিজেকে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত দ্বীনী শিক্ষা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান বলে পরিচয় দেয়। এর অর্থ, শিক্ষা, চরিত্র গঠন ও সেবার কাজই এর কেন্দ্রবিন্দু। এ প্রসঙ্গে ভারসাম্যের আলোচনা পাবেন দ্বীনে মধ্যপন্থা ও রাজনীতিমুক্ত দ্বীনি খেদমত লেখায়।

পরিষদ এখন কী কাজ করে?

পরিষদের পরিচিত কাজের মধ্যে আছে:

  • কেন্দ্রীয় পরীক্ষা পরিচালনা ও ফলাফল প্রকাশ;
  • ছয় স্তরের ১৫ বছরের সিলেবাস প্রণয়ন;
  • অধীনস্থ মাদরাসার তা'লিম-তারবিয়াত তদারকি ও আয়-ব্যয়ের অডিট;
  • শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন নির্ধারণ ও বৃদ্ধি;
  • ইসলাহি মাহফিল ও মজলিস;
  • নূরানী শিক্ষক প্রশিক্ষণ।

জেলাভিত্তিক আঞ্চলিক কমিটির মাধ্যমে অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর খোঁজখবর ও তদারকি করা হয়। পরিষদের সাথে ৮০০+ মাদরাসা ও প্রতিষ্ঠান সম্পৃক্ত; এরা পরামর্শ নেয় এবং পরিষদের নির্দেশনায় চলে। সংখ্যাটি এমন একটি হিসাব, যা কম-বেশি হতে পারে, তাই "৮০০+" লেখা হয়।

এই লক্ষ্য থেকে আমরা কী শিখতে পারি?

প্রতিষ্ঠাতার উদ্যোগ আমাদের শেখায়, শিক্ষা ও তাযকিয়ার কাজ একা হয় না, তার জন্য সংগঠন, কমিটি ও ধারাবাহিকতা দরকার। মাদরাসা পরিচালকদের জন্য এর অর্থ, নিজ প্রতিষ্ঠানেও স্পষ্ট লক্ষ্য, দায়িত্ব বণ্টন ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রস্তুতি রাখা। এ বিষয়ে ভাবতে পারেন মুহতামিম বদলে দায়িত্ব হস্তান্তরের নিয়ম পড়ে।

এই দর্শন থেকে একটি মাদরাসা কী নিতে পারে?

পরিষদের লক্ষ্য রাজনীতিমুক্তভাবে দ্বীনী শিক্ষা ও সেবা। একটি মাদরাসা এ থেকে তিনটি জিনিস নিতে পারে: প্রথমত, শিক্ষা হবে সুন্নাহর আলোকে; দ্বিতীয়ত, শিক্ষার সাথে চরিত্র গঠন ও তাযকিয়া থাকবে; তৃতীয়ত, ব্যবস্থাপনা হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক।

শুরু করবেন কীভাবে?

  • নিজের মাদরাসার লক্ষ্য এক বাক্যে লিখুন।
  • সেটি পরিষদের লক্ষ্যের সাথে মেলে কি না ভাবুন।
  • শিক্ষকদের সাথে লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা করুন।
  • প্রতিটি সিদ্ধান্তের আগে প্রশ্ন করুন, এটি লক্ষ্যের সহায়ক কি?
  • পরিষদের গঠনতন্ত্র দেখুন গঠনতন্ত্র পৃষ্ঠায়।

পরিষদ কী, তা বুঝতে শিক্ষা বোর্ড কী এবং জামিয়ার ইতিহাস জানতে জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর: ইতিহাসের সারকথা পড়ুন।

সাধারণ ভুল ও সমাধান

ভুলসমাধান
লক্ষ্যকে শুধু কাগজে রাখাদৈনন্দিন কাজে প্রতিফলন ঘটান
দলাদলিতে জড়ানোপরিষদের রাজনীতিমুক্ত নীতি মানুন
ভিন্নমত পোষণকারীদের অসম্মানসম্মান ও আদব বজায় রাখুন
শুধু অনুষ্ঠানে দর্শনের কথা বলাকাজে মেনে চলুন

নিজের মূল্যায়নের তালিকা

  • আমাদের শিক্ষা কি সুন্নাহর দিকনির্দেশনা মেনে চলে?
  • তাযকিয়ার জন্য নিয়মিত ব্যবস্থা আছে কি?
  • ব্যবস্থাপনা স্বচ্ছ কি?
  • আমরা কি সমাজের কাছে আমানতদার?

উদ্দেশ্যের স্মরণ

একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা যে উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেন, সময়ের সাথে তা ক্ষীণ হয়ে যেতে পারে। তাই মাঝে মাঝে মূল উদ্দেশ্যে ফিরে তাকানো প্রয়োজন। এই স্মরণ ইখলাস টিকিয়ে রাখে এবং প্রতিষ্ঠানকে পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে বাঁচায়।

প্রাসঙ্গিক পড়ার তালিকা

পরিষদ কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে আঞ্চলিক কমিটির ভূমিকা এবং তদারকি ও পরিদর্শন পড়ুন। আর অন্তর্ভুক্তির পথ জানতে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবেন দেখুন।

প্রশ্ন করার অভ্যাস

কোনো সংগঠনের লক্ষ্য নিয়ে আগ্রহী মানুষ প্রশ্ন করতেই পারেন, এবং এটি ভালো লক্ষণ। প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পরিষদের পরিচিতি পৃষ্ঠা ও যোগাযোগ পৃষ্ঠা কাজে লাগাতে পারেন। উত্তর পাওয়ার জন্য ধৈর্য ধরুন এবং ভদ্রভাবে প্রশ্ন করুন।

কুরআন ও হাদীসের আলোকে

এই বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের একটি করে নির্দেশনা দেখা যায়।

۞ إِنَّ ٱللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا۟ ٱلْأَمَٰنَٰتِ إِلَىٰٓ أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ ٱلنَّاسِ أَن تَحْكُمُوا۟ بِٱلْعَدْلِ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِۦٓ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ سَمِيعًۢا بَصِيرًۭا

নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদিগকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষের কোন বিচার-মীমাংসা করতে আরম্ভ কর, তখন মীমাংসা কর ন্যায় ভিত্তিক। আল্লাহ তোমাদিগকে সদুপদেশ দান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।

সূরা নিসা, আয়াত ৪:৫৮

আমানত যোগ্য হাতে তুলে দেওয়া এবং ন্যায়ের সাথে বিচার করার এই নির্দেশ পরীক্ষা, মূল্যায়ন ও সনদ প্রদানে সততার ভিত্তি।

الدِّينُ النَّصِيحَةُ قُلْنَا لِمَنْ قَالَ لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ

ভাবার্থ: দ্বীন হলো কল্যাণকামনা: আল্লাহ, তাঁর কিতাব, রাসূল, মুসলিম নেতৃত্ব ও সাধারণ মুসলিমের জন্য।

সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৫

দ্বীন হলো কল্যাণকামনা। বোর্ড, মাদরাসা ও শিক্ষক একে অপরের ভালো চাইলে নিয়ম ও পরামর্শ দুটোই সহজে মানা যায়।

সংক্ষেপে করণীয়

  • পরিষদের প্রতিষ্ঠার তারিখ, প্রতিষ্ঠাতা ও লক্ষ্যগুলো জেনে রাখুন।
  • সদস্য মাদরাসাকে লক্ষ্যের আলোকে নিজেদের কার্যক্রম মিলিয়ে দেখতে উৎসাহ দিন।
  • বিস্তারিত নীতির জন্য পরিষদের গঠনতন্ত্র পড়ুন।
  • সর্বশেষ তথ্যের জন্য অফিসিয়াল নোটিশ অনুসরণ করুন।

প্রশ্নোত্তর

পরিষদ কবে ও কার হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়?

২০১০ সালের ৮ জুলাই, আল্লামা শাহ জমির উদ্দীন নানুপুরী (রহ.)-এর হাতে, ৩৬ সদস্যের একটি কমিটির সমন্বয়ে।

নতুন কমিটি কবে গঠিত হয়?

২০১৪ সালের ১০ জুন, প্রতিষ্ঠাতার মিশন এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে।

পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান কে?

জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুরের মুহতামিম আল্লামা শাহ ছালাহ্ উদ্দীন নানুপুরী। সেক্রেটারি জেনারেল আল্লামা রফিক।

পরিষদ কি রাজনৈতিক সংগঠন?

না। পরিষদ নিজেকে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত দ্বীনী শিক্ষা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান বলে পরিচয় দেয়।

এই লেখা পরিষদের সম্পাদনা পরিষদের পক্ষ থেকে সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য। ফিকহী বা আইনগত বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

#প্রতিষ্ঠাতা#লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য#জমিরিয়া পরিষদ#নানুপুরী

আরও পড়ুন

বোর্ড ও পরীক্ষা

জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর: ইতিহাসের সারকথা

ফটিকছড়ির নানুপুরে অবস্থিত জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়ার প্রতিষ্ঠা, মুহতামিমদের ধারা ও জমিরিয়া পরিষদের সঙ্গে এর সম্পর্কের সারসংক্ষেপ।

৬ মিনিটে পড়া · ৬ নভেম্বর ২০২৬

বোর্ড ও পরীক্ষা

শিক্ষা বোর্ড কী ও কেন দরকার

শিক্ষা বোর্ড কী, মাদরাসার জন্য কেন তা দরকার এবং একটি বোর্ড সাধারণত কী কী কাজ করে, তার সহজ ব্যাখ্যা এই লেখায় পাবেন।

৫ মিনিটে পড়া · ৬ নভেম্বর ২০২৬

বোর্ড ও পরীক্ষা

জেলাভিত্তিক আঞ্চলিক কমিটির ভূমিকা

জমিরিয়া পরিষদের জেলাভিত্তিক আঞ্চলিক কমিটি কী, কেন গঠিত হয়, সদস্য মাদরাসার সঙ্গে এর সম্পর্ক কেমন এবং মাদরাসা কীভাবে সহযোগিতা করবে।

৬ মিনিটে পড়া · ৬ নভেম্বর ২০২৬

তাযকিয়া ও আখলাক

দ্বীনে মধ্যপন্থা ও রাজনীতিমুক্ত দ্বীনি খেদমত

দ্বীনে মধ্যপন্থা বলতে কী বোঝায়, বাড়াবাড়ি ও শিথিলতা থেকে বাঁচার উপায় এবং কেন শিক্ষা ও সেবার কাজ রাজনীতিমুক্ত থাকা কল্যাণকর, তা নিয়ে আলোচনা।

৫ মিনিটে পড়া · ৬ নভেম্বর ২০২৬