বিনয় ও অহংকার: ইলমের পথে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
৬ নভেম্বর ২০২৬ · ৫ মিনিটে পড়া · জমিরিয়া তা'লিম ও তায্কিয়া পরিষদ
বিনয় মানে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে আল্লাহর সামনে এবং মানুষের সামনে নম্র থাকা, আর অহংকার মানে নিজেকে বড় ভাবা ও অন্যকে তুচ্ছ মনে করা। ইসলামে অহংকার গুরুতর অন্তরের রোগ হিসেবে গণ্য এবং বিনয় উত্তম আখলাক। যাঁরা ইলম অর্জন করেন, তাঁদের জন্য এই বিষয়ে সতর্কতা আরও বেশি দরকার।
বিনয় বলতে ঠিক কী বোঝায়?
বিনয় নিজেকে হীন ভাবা নয়, এটি বাস্তবতা স্বীকার করা: আমার যা আছে সবই আল্লাহর দান, আমার জ্ঞান সীমিত, আমি ভুল করতে পারি এবং অন্যের কাছেও আমার শেখার আছে। বিনয়ী মানুষ সত্য কথা শুনে মেনে নিতে পারেন, বয়স বা পদ নির্বিশেষে মানুষকে সম্মান করেন এবং প্রশংসায় ফুলে ওঠেন না।
কুরআন ও হাদীসে অহংকারের নিন্দা এবং বিনয়ের প্রশংসা আছে। সুনির্দিষ্ট আয়াত ও হাদীসের ব্যাখ্যা নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে জেনে নিন।
অহংকারের সূক্ষ্ম লক্ষণ কী কী?
অহংকার সবসময় স্পষ্ট নয়। অনেক সময় তা সূক্ষ্মভাবে লুকিয়ে থাকে। কিছু লক্ষণ:
- নিজের ভুল স্বীকার করতে কঠিন লাগা।
- সংশোধন বা উপদেশ শুনলে রাগ বা অপমান বোধ করা।
- কম জানা মানুষকে তুচ্ছ বা বোকা মনে করা।
- নিজের ইলম, বংশ, পদ বা চেহারা নিয়ে বারবার গর্ব করা।
- সবার সামনে নিজেকে জাহির করতে ভালো লাগা।
- অন্যের কাছ থেকে শেখাকে ছোট মনে করা।
- নিজেকে অন্যের চেয়ে বেশি পরহেজগার ভাবা।
ইলমের অহংকার কেন বিশেষ বিপজ্জনক?
যে ছাত্র বা আলেম কিছু শিখে নিজেকে সবার ওপরে মনে করেন, তাঁর জ্ঞান কল্যাণের বদলে ফিতনার কারণ হতে পারে। তিনি অন্যকে ছোট করে দেখেন, সহজে তর্কে জড়ান এবং নতুন কিছু শিখতে আগ্রহ হারান। আকাবিরের জীবনীতে দেখা যায়, যত বড় আলেম, তত বেশি বিনয়ী এবং নিজের ইলম নিয়ে সংকোচ। এ থেকে বোঝা যায়, ইলম ও বিনয় একসাথে বাড়ে।
বিনয়ী হওয়ার ব্যবহারিক অভ্যাস কী?
বিনয় অভ্যাসের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। কিছু সহজ উপায়:
- সালাম দেওয়া ও সম্মান করা: ছোট-বড় সবাইকে আগে সালাম দেওয়ার চেষ্টা।
- না জানলে বলা: জানি না, এ কথা বলতে লজ্জা না পাওয়া।
- ভুল স্বীকার করা: ক্ষমা চাওয়া ও সংশোধন করা।
- উপদেশ গ্রহণ করা: ছোট বা বড় যে-ই সঠিক কথা বলুক, শুনে বিবেচনা করা।
- ছোটখাটো সেবা করা: নিজের কাজ নিজে করা, মেহমান ও বড়দের সেবায় এগিয়ে আসা।
- নিজের নেয়ামতের জন্য শোকর: কৃতিত্ব আল্লাহর দিকে ফেরানো। সবর ও শোকর লেখাটি সহায়ক।
- প্রশংসায় সতর্ক থাকা: প্রশংসা শুনে নিজের দুর্বলতাও মনে করা।
- নিজের গুনাহ স্মরণ রাখা: অন্যকে বিচার করার আগে নিজের ঘাটতি দেখা।
ছাত্র, শিক্ষক ও পরিচালকের জন্য বিনয়
ছাত্রের জন্য: উস্তাদের সামনে আদব, সহপাঠীর সাথে নম্রতা এবং ভালো ফলের পর অহংকার না করা। ইলম অর্জনের আদব নিয়ে আলাদা লেখা আছে।
শিক্ষকের জন্য: ছাত্রের প্রশ্নে ধৈর্য, নিজের ভুল স্বীকার, দুর্বল ছাত্রকে তুচ্ছ না ভাবা এবং সহকর্মীর কাছ থেকে শেখার মানসিকতা।
পরিচালক ও কমিটির জন্য: পদকে সেবার সুযোগ মনে করা, সমালোচনা ও পরামর্শ ধৈর্য ধরে শোনা এবং কর্মচারী ও শিক্ষকদের সম্মান করা।
অহংকার ও আত্মমর্যাদার পার্থক্য কী?
কেউ কেউ আত্মমর্যাদাকে অহংকার ভেবে ভুল করেন। নিজের দ্বীন ও সম্মান রক্ষা করা, অন্যায়ের সামনে নতজানু না হওয়া এবং নিজের কাজে আত্মবিশ্বাস রাখা আত্মমর্যাদা। কিন্তু সত্য প্রত্যাখ্যান করা ও অন্যকে তুচ্ছ করা অহংকার। বিনয়ী মানুষও দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী হতে পারেন। সূক্ষ্ম বিষয়ে বিস্তারিত নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে জানুন।
অহংকার টের পেলে কী করব?
- আতঙ্কিত না হয়ে তাওবা ও ইস্তিগফার করুন। তাওবা ও ইস্তিগফারের ব্যবহারিক দিক লেখাটি দেখুন।
- সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে অন্যায় আচরণ হয়ে থাকলে ক্ষমা চান।
- অভিজ্ঞ মুরব্বির সাথে পরামর্শ করে ইসলাহের পথ নিন।
- ইচ্ছা করে সহজ ও বিনয়ী কাজ করুন, যেমন বড়দের সেবা।
- নিজের মৃত্যু ও আখিরাতের কথা মাঝে মাঝে স্মরণ করুন।
বিনয় চর্চার সাত দিনের একটি ছোট পরিকল্পনা
একসাথে বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়, তাই এক সপ্তাহের ছোট চেষ্টা দিয়ে শুরু করুন।
- প্রথম দিন: আজ কারো কথা কেটে না দিয়ে পুরোটা শুনব।
- দ্বিতীয় দিন: একজনের কাছ থেকে কিছু শিখব এবং তাঁকে ধন্যবাদ জানাব।
- তৃতীয় দিন: একটি ভুল স্বীকার করব।
- চতুর্থ দিন: ছোটদের সাথে সালাম ও নম্র আচরণে এগিয়ে থাকব।
- পঞ্চম দিন: কারো কাজের প্রশংসা করব।
- ষষ্ঠ দিন: একটি কাজ গোপনে করব।
- সপ্তম দিন: সপ্তাহের হিসাব নেব।
একটি সাধারণ দৃশ্যপট
এক মেধাবী ছাত্র ক্লাসে প্রায়ই সহপাঠীদের ভুল ধরিয়ে দিত, প্রায় অবজ্ঞার সুরে। শিক্ষক তাকে একান্তে বললেন, সঠিক কথাও নরমভাবে বলা যায়। ছাত্রটি প্রথমে অস্বস্তিতে পড়ল, পরে চেষ্টা করল। ধীরে ধীরে বন্ধুরা তার কাছে প্রশ্ন নিয়ে আসতে শুরু করল।
সাধারণ ভুল ও সংশোধন
- ভুল: বিনয় মানে নিজেকে ছোট করা। সংশোধন: সত্যকে সত্য বলুন, তবে অন্যকে হেয় করবেন না।
- ভুল: বিনয়ের ভান করে প্রশংসা চাওয়া। সংশোধন: ইখলাস ঠিক রাখুন।
- ভুল: শুধু অন্যের অহংকার খোঁজা। সংশোধন: নিজের দিকে তাকান। তাযকিয়া এই চর্চাই শেখায়।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে
এই বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের একটি করে নির্দেশনা দেখা যায়।
لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِى رَسُولِ ٱللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌۭ لِّمَن كَانَ يَرْجُوا۟ ٱللَّهَ وَٱلْيَوْمَ ٱلْءَاخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرًۭا
যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।
সূরা আহযাব, আয়াত ৩৩:২১আদর্শ চরিত্রের মাপকাঠি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন। ছোট ছোট আচরণে তাঁর অনুসরণই তাযকিয়ার বাস্তব পথ।
خِيَارُكُمْ أَحَاسِنُكُمْ أَخْلاَقًا . وَلَمْ يَكُنِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَاحِشًا وَلاَ مُتَفَحِّشًا . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ
ভাবার্থ: কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে প্রিয় ও নিকটে থাকবে তোমাদের মধ্যে যারা সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী।
জামে তিরমিযী, হাদীস নং ১৯৭৫ (আলবানীর মতে সহীহ)ভালো চরিত্র আখিরাতে নৈকট্যের কারণ। আখলাক শুধু জানার বিষয় নয়, রোজকার আচরণে চর্চা করার বিষয়।
সংক্ষেপে করণীয়
- প্রতিদিন নিজের ইলম, সুযোগ ও সাফল্যকে আল্লাহর দান বলে স্মরণ করুন।
- ভুল স্বীকার ও উপদেশ গ্রহণের অভ্যাস করুন।
- অন্যকে তুচ্ছ করা থেকে বিরত থাকুন।
- ছোট ছোট সেবার কাজে নিজেকে যুক্ত রাখুন।
- অহংকারের লক্ষণ দেখলে তাওবা করুন এবং মুরব্বির পরামর্শ নিন।
প্রশ্নোত্তর
ভালো পোশাক বা পরিচ্ছন্নতা কি অহংকার?
পরিচ্ছন্নতা ও ভদ্র পোশাক দোষের নয়। অহংকার তখনই হয়, যখন এগুলো নিয়ে অন্যকে ছোট ভাবা হয়। সুনির্দিষ্ট বিধান নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে জেনে নিন।
প্রশংসা শুনলে খুশি হওয়া কি অহংকার?
খুশি হওয়া স্বাভাবিক, তবে প্রশংসাকে নিজের কৃতিত্ব ভেবে ফুলে না ওঠা এবং সেটিকে আল্লাহর দান মনে করাই বিনয়ের পথ।
বিনয় কি দুর্বলতা?
না, বিনয় শক্তিশালী চরিত্রের পরিচয়। বিনয়ী মানুষ শেখার ও সংশোধনের জন্য উন্মুক্ত থাকেন।
শিশুদের মধ্যে বিনয় কীভাবে গড়ব?
বড়দের নম্র আচরণ দেখিয়ে এবং ছোট ছোট সেবামূলক কাজে যুক্ত করে। অন্যের সাথে তুলনা না করে প্রচেষ্টার প্রশংসা করুন।
এই লেখা পরিষদের সম্পাদনা পরিষদের পক্ষ থেকে সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য। ফিকহী বা আইনগত বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
