মানুষ যেন নিজেই দান করতে পারে: স্বচ্ছ ব্যবস্থা
৬ নভেম্বর ২০২৬ · ৭ মিনিটে পড়া · জমিরিয়া তা'লিম ও তায্কিয়া পরিষদ
মানুষ নিজে থেকে দান করতে পারবে, এমন ব্যবস্থা গড়ার মূল কথা তিনটি: দান দেওয়ার পথ সহজ, হিসাব পরিষ্কার এবং ব্যবহারের খবর নিয়মিত। যে মাদরাসা এই তিনটি ঠিক রাখে, দাতার আস্থা ধীরে ধীরে তৈরি হয়। তখন মাদরাসাকে বছরভর দরজায় দরজায় ঘুরে চাঁদা তুলতে হয় না। এই লেখায় সাধারণ ব্যবস্থাপনার দিক আলোচনা করা হলো; যাকাত, সদাকা ও দানের শরয়ী হুকুম নির্ভরযোগ্য মুফতী সাহেবের কাছ থেকে জেনে নিন।
কেন দাতার জন্য ব্যবস্থা সহজ করা দরকার?
অনেক মানুষ দান করতে চান, কিন্তু কোথায় দেবেন, কাকে দেবেন, আর সেই টাকা ঠিকমতো ব্যবহার হবে কি না, এই সংশয়ে থাকেন। ব্যবস্থা পরিষ্কার না হলে ইচ্ছা থাকলেও দান পৌঁছায় না।
আবার সংগ্রাহকের ওপর নির্ভর করা ব্যবস্থায় আয় ওঠানামা করে। দাতা নিজে থেকে নিয়মিত দিতে পারলে আয় স্থিতিশীল হয়। এই ভাবনা আছে কালেকশননির্ভর নয়, স্বনির্ভর মাদরাসা লেখায়।
দান গ্রহণের ব্যবস্থা কেমন হবে?
ব্যবস্থা এমন হবে, যাতে দাতা একবার দেখেই বুঝতে পারেন কীভাবে দেবেন। সাধারণত নিচের বিষয়গুলো কাজে আসে:
- মাদরাসার অফিসে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সরাসরি দান জমা দেওয়ার ব্যবস্থা।
- মাদরাসার নামে খোলা অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর, যা মুহতামিম বা কমিটির দায়িত্বশীলের তত্ত্বাবধানে থাকে।
- মসজিদ বা এলাকার নির্দিষ্ট স্থানে নোটিশ, যেখানে দান জমার নিয়ম লেখা থাকবে।
- ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের বদলে প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা, যাতে হিসাব মাদরাসার খাতায় ওঠে।
কোন ধরনের অ্যাকাউন্ট খোলা যায়, সে বিষয়ে প্রযোজ্য আইন ও সরকারি নিয়ম এবং ব্যাংকের নিয়ম আগে জেনে নিন।
প্রতিটি দানের জন্য কী কী রেকর্ড রাখবেন?
স্বচ্ছতার প্রথম ধাপ হলো প্রতিটি দানের নিয়মিত রেকর্ড। আপনি এই কাজগুলো করতে পারেন:
- প্রতিটি দানের জন্য রসিদ দিন এবং রসিদের কপি রাখুন।
- দাতার নাম, পরিমাণ, তারিখ এবং দানের উদ্দেশ্য (যেমন সাধারণ, ইয়াতিম ছাত্র, নির্মাণ) লিখুন। দাতা নাম গোপন রাখতে চাইলে তা সম্মান করুন।
- অনলাইনে বা মোবাইলে আসা দানের লেনদেন-নম্বর খাতায় তুলুন।
- সপ্তাহে বা মাসে অন্তত একবার নগদ ও অ্যাকাউন্টের হিসাব মিলিয়ে দেখুন।
এসব রেকর্ডের ভিত্তিতেই পরে অডিট ও দাতা-প্রতিবেদন তৈরি হয়। হিসাবের খাতার নিয়ম নিয়ে জানতে দেখুন হিসাবের খাতা: আয়-ব্যয়, রসিদ ও ভাউচার।
দানের খাত আলাদা রাখবেন কীভাবে?
দাতা সাধারণ দান, সদাকা বা যাকাত দিলে তা আলাদা তহবিলে রাখতে হবে। কারণ প্রতিটির ব্যয়ের খাত ও শর্ত ভিন্ন হতে পারে। কোন অর্থ কোন খাতে খরচ করা যাবে, তা ফিকহী প্রশ্ন, তাই মুফতী সাহেবের নির্দেশনা নিন। ব্যবস্থাপনার দিকটি দেখুন চাঁদা, সদাকা ও যাকাতের তহবিল আলাদা রাখার নিয়ম লেখায়।
দাতা কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য জানালে সেই উদ্দেশ্যেই ব্যয় করুন। উদ্দেশ্য বদলাতে হলে আগে দাতার সম্মতি নিন এবং বিষয়টি লিখে রাখুন।
দাতাকে কীভাবে জানাবেন দান কোথায় গেল?
দাতার আস্থা ধরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত জানানো। খুব আড়ম্বর লাগে না; সংক্ষিপ্ত ও সত্য প্রতিবেদনই যথেষ্ট:
- কত দান এল এবং কোন কোন খাতে খরচ হলো, তার সারাংশ।
- নোটিশ বোর্ডে, মসজিদের ঘোষণায় বা দাতার সম্মতি থাকলে মোবাইল বার্তায় জানানো।
- অডিটের ফল সংক্ষেপে সবাইকে দেখানো।
বিস্তারিত পদ্ধতি পাবেন দাতাদের কাছে স্বচ্ছ প্রতিবেদন লেখায়। মনে রাখবেন, প্রতিবেদনে কেবল সত্য তথ্য দিন এবং এমন কিছু লিখবেন না, যা প্রমাণ করা যায় না।
আস্থা তৈরিতে মুহতামিম ও কমিটির করণীয় কী?
আস্থা তৈরি হয় আচরণ থেকে। মুহতামিম ও কমিটির দায়িত্বশীলরা দানের টাকা ব্যক্তিগত কাজে মেশাবেন না, হিসাব চাইলে বিরক্ত হবেন না এবং ভুল হলে স্বীকার করে শুধরে নেবেন। অভিযোগ বা প্রশ্ন আসার একটি পরিষ্কার পথ রাখুন, যেমন কমিটির একজন দায়িত্বশীলের নাম ও যোগাযোগ।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে
এই বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের একটি করে নির্দেশনা দেখা যায়।
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيْنٍ إِلَىٰٓ أَجَلٍۢ مُّسَمًّۭى فَٱكْتُبُوهُ ۚ وَلْيَكْتُب بَّيْنَكُمْ كَاتِبٌۢ بِٱلْعَدْلِ ۚ وَلَا يَأْبَ كَاتِبٌ أَن يَكْتُبَ كَمَا عَلَّمَهُ ٱللَّهُ ۚ فَلْيَكْتُبْ وَلْيُمْلِلِ ٱلَّذِى عَلَيْهِ ٱلْحَقُّ وَلْيَتَّقِ ٱللَّهَ رَبَّهُۥ وَلَا يَبْخَسْ مِنْهُ شَيْـًۭٔا ۚ فَإِن كَانَ ٱلَّذِى عَلَيْهِ ٱلْحَقُّ سَفِيهًا أَوْ ضَعِيفًا أَوْ لَا يَسْتَطِيعُ أَن يُمِلَّ هُوَ فَلْيُمْلِلْ وَلِيُّهُۥ بِٱلْعَدْلِ ۚ وَٱسْتَشْهِدُوا۟ شَهِيدَيْنِ مِن رِّجَالِكُمْ ۖ فَإِن لَّمْ يَكُونَا رَجُلَيْنِ فَرَجُلٌۭ وَٱمْرَأَتَانِ مِمَّن تَرْضَوْنَ مِنَ ٱلشُّهَدَآءِ أَن تَضِلَّ إِحْدَىٰهُمَا فَتُذَكِّرَ إِحْدَىٰهُمَا ٱلْأُخْرَىٰ ۚ وَلَا يَأْبَ ٱلشُّهَدَآءُ إِذَا مَا دُعُوا۟ ۚ وَلَا تَسْـَٔمُوٓا۟ أَن تَكْتُبُوهُ صَغِيرًا أَوْ كَبِيرًا إِلَىٰٓ أَجَلِهِۦ ۚ ذَٰلِكُمْ أَقْسَطُ عِندَ ٱللَّهِ وَأَقْوَمُ لِلشَّهَٰدَةِ وَأَدْنَىٰٓ أَلَّا تَرْتَابُوٓا۟ ۖ إِلَّآ أَن تَكُونَ تِجَٰرَةً حَاضِرَةًۭ تُدِيرُونَهَا بَيْنَكُمْ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَلَّا تَكْتُبُوهَا ۗ وَأَشْهِدُوٓا۟ إِذَا تَبَايَعْتُمْ ۚ وَلَا يُضَآرَّ كَاتِبٌۭ وَلَا شَهِيدٌۭ ۚ وَإِن تَفْعَلُوا۟ فَإِنَّهُۥ فُسُوقٌۢ بِكُمْ ۗ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۖ وَيُعَلِّمُكُمُ ٱللَّهُ ۗ وَٱللَّهُ بِكُلِّ شَىْءٍ عَلِيمٌۭ
হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ঋনের আদান-প্রদান কর, তখন তা লিপিবদ্ধ করে নাও এবং তোমাদের মধ্যে কোন লেখক ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লিখে দেবে; লেখক লিখতে অস্বীকার করবে না। আল্লাহ তাকে যেমন শিক্ষা দিয়েছেন, তার উচিত তা লিখে দেয়া। এবং ঋন গ্রহীতা যেন লেখার বিষয় বলে দেয় এবং সে যেন স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্রও বেশ কম না করে। অতঃপর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দূর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বলে দিতে অক্ষম হয়, তবে তার অভিভাবক ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখাবে। দুজন সাক্ষী কর, তোমাদের পুরুষদের মধ্যে থেকে। যদি দুজন পুরুষ না হয়, তবে একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা। ঐ সাক্ষীদের মধ্য থেকে যাদেরকে তোমরা পছন্দ কর যাতে একজন যদি ভুলে যায়, তবে একজন অন্যজনকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যখন ডাকা হয়, তখন সাক্ষীদের অস্বীকার করা উচিত নয়। তোমরা এটা লিখতে অলসতা করোনা, তা ছোট হোক কিংবা বড়, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এ লিপিবদ্ধ করণ আল্লাহর কাছে সুবিচারকে অধিক কায়েম রাখে, সাক্ষ্যকে অধিক সুসংহত রাখে এবং তোমাদের সন্দেহে পতিত না হওয়ার পক্ষে অধিক উপযুক্ত। কিন্তু যদি কারবার নগদ হয়, পরস্পর হাতে হাতে আদান-প্রদান কর, তবে তা না লিখলে তোমাদের প্রতি কোন অভিযোগ নেই। তোমরা ক্রয়-বিক্রয়ের সময় সাক্ষী রাখ। কোন লেখক ও সাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করো না। যদি তোমরা এরূপ কর, তবে তা তোমাদের পক্ষে পাপের বিষয়। আল্লাহকে ভয় কর তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আল্লাহ সব কিছু জানেন।
সূরা বাকারা, আয়াত ২:২৮২লেনদেন লিখে রাখার এই নির্দেশ হিসাব-নিকাশের স্বচ্ছতার মূল ভিত্তি। আয়-ব্যয়ের খাতা, রসিদ ও ভাউচার রাখা এই শিক্ষারই বাস্তব রূপ।
عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَصْدُقُ وَيَتَحَرَّى الصِّدْقَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ صِدِّيقًا وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ كَذَّابًا
ভাবার্থ: তোমরা সত্যকে আঁকড়ে ধরো; সত্য নেকীর পথ দেখায়, আর নেকী জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।
সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬০৭সত্যবাদিতা হিসাবেও জরুরি। যা আয় হয়েছে ও যা ব্যয় হয়েছে তা যেমন তেমন লেখা এবং কোনো কিছু গোপন না করাই আমানতদারি।
সংক্ষেপে করণীয়
- দান জমার পথ সহজ ও প্রকাশ্য রাখুন এবং ব্যক্তিগত নয়, প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করুন।
- প্রতিটি দানের রসিদ দিন এবং কপি সংরক্ষণ করুন।
- সাধারণ দান, সদাকা ও যাকাতের হিসাব আলাদা রাখুন; ব্যয়ের হুকুমে মুফতী সাহেবের পরামর্শ নিন।
- নিয়মিত সংক্ষিপ্ত ও সত্য দাতা-প্রতিবেদন প্রকাশ করুন।
- দাতার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য মেনে চলুন এবং অভিযোগ জানানোর পথ খোলা রাখুন।
প্রশ্নোত্তর
দাতা নাম গোপন রাখতে চাইলে কী করবেন?
তাঁর ইচ্ছাকে সম্মান করুন। খাতায় আভ্যন্তরীণ রেকর্ড রাখুন, কিন্তু প্রকাশ্য প্রতিবেদনে নাম না দিয়ে শুধু পরিমাণ বা "একজন দাতা" লিখতে পারেন। অডিটের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য দায়িত্বশীলদের কাছে সংরক্ষিত থাকবে।
অনলাইনে দান নিলে কোন বিষয়ে সাবধান হবেন?
সবচেয়ে বড় সাবধানতা হলো অ্যাকাউন্ট বা নম্বর যেন প্রতিষ্ঠানের নামে ও দায়িত্বশীলের তত্ত্বাবধানে থাকে। প্রতিটি লেনদেনের নম্বর খাতায় তুলুন এবং সাপ্তাহিকভাবে ব্যালান্স মিলান। লগইনের তথ্য কারও সাথে শেয়ার করবেন না।
দান কোন খাতে খরচ করা যাবে, তা কে ঠিক করবে?
দাতার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকলে সেটিই প্রথম বিবেচ্য। সাধারণ দান ও সদাকা কমিটির সিদ্ধান্তে খরচ হয়। কিন্তু যাকাত ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যয়ের খাত শরীয়তসম্মত কি না, তা নির্ভরযোগ্য মুফতী সাহেবের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।
দাতা-প্রতিবেদন কত ঘন ঘন দেওয়া ভালো?
কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। বাস্তবসম্মত পদ্ধতি হলো ছোট পরিসরে মাসিক বা ত্রৈমাসিক সারাংশ দেওয়া এবং বছর শেষে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা। যা নিয়মিত পারবেন, সেটিই ঠিক করুন।
এই লেখা পরিষদের সম্পাদনা পরিষদের পক্ষ থেকে সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য। ফিকহী বা আইনগত বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
