কালেকশননির্ভর নয়, স্বনির্ভর মাদরাসা: কীভাবে সম্ভব
৬ নভেম্বর ২০২৬ · ৬ মিনিটে পড়া · জমিরিয়া তা'লিম ও তায্কিয়া পরিষদ
স্বনির্ভর মাদরাসা মানে চাঁদা বন্ধ করা নয়; এর মানে হলো মাদরাসার মোট আয়ের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ নিজস্ব উৎস থেকে আসা, যেন মৌসুমি সংগ্রহ কমে গেলেও পড়াশোনা ও বেতন থেমে না যায়। এটি রাতারাতি হয় না, তবে ছোট ছোট ধাপে সম্ভব। জমিরিয়া তা'লিম ও তায্কিয়া পরিষদের অন্তর্ভুক্তির মাপকাঠিতেও ধীরে ধীরে নিজস্ব আয়ের পরিকল্পনা করার কথা বলা হয়েছে।
কেন শুধু কালেকশনের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ?
চাঁদা-নির্ভর আয় অনিশ্চিত। দাতার পরিস্থিতি বদলাতে পারে, এলাকার অর্থনীতি নড়তে পারে, আবার সংগ্রহকারীর ওপর বেশি চাপ পড়ে। এতে মুহতামিম ও শিক্ষকদের সময় পড়াশোনার বদলে সংগ্রহে চলে যায়। তাই মাদরাসার স্থিতিশীলতার জন্য আয়ের উৎস বহুমুখী করা প্রয়োজন। তবে সংগ্রহ বা দান মন্দ নয়; দান-সদাকা ইসলামে উৎসাহিত। প্রশ্নটা হলো একমাত্র ভরসা কী হবে।
স্বনির্ভরতার প্রথম ধাপ কী?
প্রথম ধাপ হলো নিজের আয়ের চিত্রটা জানা। গত কয়েক মাসের আয়-ব্যয় দেখে নিন:
- মোট আয়ের কত অংশ চাঁদা, সদাকা ও যাকাত?
- কত অংশ ছাত্র ফি বা নিজস্ব উৎস থেকে?
- কোন খাতে খরচ সবচেয়ে বেশি?
এই চিত্র মাসিক প্রতিবেদন ও অডিট প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। পড়ুন মাসিক প্রতিবেদন কীভাবে লিখবেন। যে মাদরাসা নিজের সংখ্যাই জানে না, সে পরিকল্পনাও করতে পারে না।
কোন কোন নিজস্ব আয়ের উৎস ভাবা যায়?
মাপকাঠিতে কয়েকটি উৎসের উল্লেখ আছে: ছাত্র ফি, জমি বা দোকানের আয়, প্রকাশনা, স্থায়ী তহবিল ও ওয়াকফ। এখানে সব মাদরাসার জন্য একই পথ নয়; আপনার সামর্থ্য ও এলাকা অনুযায়ী বাছাই করুন।
- ছাত্র ফি: যেসব ছাত্র দিতে সক্ষম, তাদের কাছ থেকে ন্যায্য ফি; গরিব ও ইয়াতিম ছাত্রদের জন্য আলাদা সহায়তা।
- জমি বা দোকান: মাদরাসার অতিরিক্ত জমি বা ভবনের অংশ থেকে ভাড়া বা ফসলের আয়।
- প্রকাশনা: মাদরাসার নিজস্ব লেখা, কিতাব বা শিক্ষা-উপকরণ।
- স্থায়ী তহবিল ও ওয়াকফ: দীর্ঘমেয়াদি আয়ের জন্য; পড়ুন ওয়াকফ ও স্থায়ী তহবিল।
কোন আয় শরীয়তসম্মত ও কীভাবে করা যাবে, তা নির্ভরযোগ্য মুফতী সাহেবের কাছ থেকে জেনে নিন। ব্যবসা বা ভাড়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন ও সরকারি নিয়মও দেখুন।
নিজস্ব আয় শুরু করার সময় কী সতর্কতা দরকার?
- বড় ঝুঁকিতে নামবেন না; ছোট আকারে শুরু করে দেখুন।
- নিজস্ব আয়ের হিসাব আলাদা খাতায় রাখুন, যাকাত-সদাকার তহবিলের সাথে মেশাবেন না।
- যাকাত ও সদাকার অর্থ ব্যবসায় খাটানো যায় কি না, তা মুফতী সাহেবের কাছ থেকে জানুন।
- পরিচালনার দায়িত্ব কার, তা লিখিত রাখুন এবং কমিটির অনুমোদন নিন।
- মুহতামিম যেন ব্যবসার কাজে পড়ে পড়াশোনার তদারকি থেকে সরে না যান।
দাতাদের আস্থা কীভাবে বাড়বে?
সামর্থ্যবান মানুষ নিজে থেকে নিয়মিত দান করেন, যখন তাঁরা জানেন টাকা কোথায় যাচ্ছে। তাই স্বচ্ছ হিসাব ও দাতা-প্রতিবেদন স্বনির্ভরতার অংশ। পড়ুন দাতাদের কাছে স্বচ্ছ প্রতিবেদন এবং মানুষ যেন নিজেই দান করতে পারে। মাসিক আয়-ব্যয়ের সারসংক্ষেপ নিয়মিত জানালে সংগ্রহের চাপও কমে।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে
এই বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের একটি করে নির্দেশনা দেখা যায়।
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيْنٍ إِلَىٰٓ أَجَلٍۢ مُّسَمًّۭى فَٱكْتُبُوهُ ۚ وَلْيَكْتُب بَّيْنَكُمْ كَاتِبٌۢ بِٱلْعَدْلِ ۚ وَلَا يَأْبَ كَاتِبٌ أَن يَكْتُبَ كَمَا عَلَّمَهُ ٱللَّهُ ۚ فَلْيَكْتُبْ وَلْيُمْلِلِ ٱلَّذِى عَلَيْهِ ٱلْحَقُّ وَلْيَتَّقِ ٱللَّهَ رَبَّهُۥ وَلَا يَبْخَسْ مِنْهُ شَيْـًۭٔا ۚ فَإِن كَانَ ٱلَّذِى عَلَيْهِ ٱلْحَقُّ سَفِيهًا أَوْ ضَعِيفًا أَوْ لَا يَسْتَطِيعُ أَن يُمِلَّ هُوَ فَلْيُمْلِلْ وَلِيُّهُۥ بِٱلْعَدْلِ ۚ وَٱسْتَشْهِدُوا۟ شَهِيدَيْنِ مِن رِّجَالِكُمْ ۖ فَإِن لَّمْ يَكُونَا رَجُلَيْنِ فَرَجُلٌۭ وَٱمْرَأَتَانِ مِمَّن تَرْضَوْنَ مِنَ ٱلشُّهَدَآءِ أَن تَضِلَّ إِحْدَىٰهُمَا فَتُذَكِّرَ إِحْدَىٰهُمَا ٱلْأُخْرَىٰ ۚ وَلَا يَأْبَ ٱلشُّهَدَآءُ إِذَا مَا دُعُوا۟ ۚ وَلَا تَسْـَٔمُوٓا۟ أَن تَكْتُبُوهُ صَغِيرًا أَوْ كَبِيرًا إِلَىٰٓ أَجَلِهِۦ ۚ ذَٰلِكُمْ أَقْسَطُ عِندَ ٱللَّهِ وَأَقْوَمُ لِلشَّهَٰدَةِ وَأَدْنَىٰٓ أَلَّا تَرْتَابُوٓا۟ ۖ إِلَّآ أَن تَكُونَ تِجَٰرَةً حَاضِرَةًۭ تُدِيرُونَهَا بَيْنَكُمْ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَلَّا تَكْتُبُوهَا ۗ وَأَشْهِدُوٓا۟ إِذَا تَبَايَعْتُمْ ۚ وَلَا يُضَآرَّ كَاتِبٌۭ وَلَا شَهِيدٌۭ ۚ وَإِن تَفْعَلُوا۟ فَإِنَّهُۥ فُسُوقٌۢ بِكُمْ ۗ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۖ وَيُعَلِّمُكُمُ ٱللَّهُ ۗ وَٱللَّهُ بِكُلِّ شَىْءٍ عَلِيمٌۭ
হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ঋনের আদান-প্রদান কর, তখন তা লিপিবদ্ধ করে নাও এবং তোমাদের মধ্যে কোন লেখক ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লিখে দেবে; লেখক লিখতে অস্বীকার করবে না। আল্লাহ তাকে যেমন শিক্ষা দিয়েছেন, তার উচিত তা লিখে দেয়া। এবং ঋন গ্রহীতা যেন লেখার বিষয় বলে দেয় এবং সে যেন স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্রও বেশ কম না করে। অতঃপর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দূর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বলে দিতে অক্ষম হয়, তবে তার অভিভাবক ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখাবে। দুজন সাক্ষী কর, তোমাদের পুরুষদের মধ্যে থেকে। যদি দুজন পুরুষ না হয়, তবে একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা। ঐ সাক্ষীদের মধ্য থেকে যাদেরকে তোমরা পছন্দ কর যাতে একজন যদি ভুলে যায়, তবে একজন অন্যজনকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যখন ডাকা হয়, তখন সাক্ষীদের অস্বীকার করা উচিত নয়। তোমরা এটা লিখতে অলসতা করোনা, তা ছোট হোক কিংবা বড়, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এ লিপিবদ্ধ করণ আল্লাহর কাছে সুবিচারকে অধিক কায়েম রাখে, সাক্ষ্যকে অধিক সুসংহত রাখে এবং তোমাদের সন্দেহে পতিত না হওয়ার পক্ষে অধিক উপযুক্ত। কিন্তু যদি কারবার নগদ হয়, পরস্পর হাতে হাতে আদান-প্রদান কর, তবে তা না লিখলে তোমাদের প্রতি কোন অভিযোগ নেই। তোমরা ক্রয়-বিক্রয়ের সময় সাক্ষী রাখ। কোন লেখক ও সাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করো না। যদি তোমরা এরূপ কর, তবে তা তোমাদের পক্ষে পাপের বিষয়। আল্লাহকে ভয় কর তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আল্লাহ সব কিছু জানেন।
সূরা বাকারা, আয়াত ২:২৮২লেনদেন লিখে রাখার এই নির্দেশ হিসাব-নিকাশের স্বচ্ছতার মূল ভিত্তি। আয়-ব্যয়ের খাতা, রসিদ ও ভাউচার রাখা এই শিক্ষারই বাস্তব রূপ।
عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَصْدُقُ وَيَتَحَرَّى الصِّدْقَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ صِدِّيقًا وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ كَذَّابًا
ভাবার্থ: তোমরা সত্যকে আঁকড়ে ধরো; সত্য নেকীর পথ দেখায়, আর নেকী জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।
সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬০৭সত্যবাদিতা হিসাবেও জরুরি। যা আয় হয়েছে ও যা ব্যয় হয়েছে তা যেমন তেমন লেখা এবং কোনো কিছু গোপন না করাই আমানতদারি।
সংক্ষেপে করণীয়
- গত কয়েক মাসের আয়ের চিত্র দেখে চাঁদা-নির্ভরতার অংশ জানুন।
- কমিটিতে আলোচনা করে ছোট একটি নিজস্ব আয়ের পরিকল্পনা নিন।
- আয়ের নতুন উৎসের শরয়ী ও আইনি দিক মুফতী সাহেব ও সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে জেনে নিন।
- নিজস্ব আয়ের হিসাব আলাদা রাখুন এবং মাসিক প্রতিবেদনে নিজস্ব আয়ের খাতে লিখুন।
- দাতাদের নিয়মিত স্বচ্ছ হিসাব জানান।
প্রশ্নোত্তর
স্বনির্ভর হতে হলে কি চাঁদা নেওয়া বন্ধ করতে হবে?
না। চাঁদা, সদাকা ও যাকাত মাদরাসার বড় সহায়তা। লক্ষ্য হলো ধীরে ধীরে নিজস্ব আয়ের অংশ বাড়ানো, যেন একটিমাত্র উৎস বন্ধ হলে মাদরাসা বিপদে না পড়ে।
ছোট মাদরাসা কীভাবে শুরু করবে?
সবচেয়ে সহজ শুরু হলো হিসাব স্বচ্ছ করা, ন্যায্য ছাত্র ফির ব্যবস্থা ভাবা এবং এলাকার সামর্থ্যবানদের নিয়মিত সহায়তায় যুক্ত করা। ছোট হলে ছোট উৎস দিয়েই শুরু করুন; এ নিয়ে দেখুন মাদরাসার টেকসই আয়ের উৎস।
যাকাতের টাকা দিয়ে ব্যবসা করা যায় কি?
এটি ফিকহী প্রশ্ন, এখানে কোনো হুকুম দেওয়া হচ্ছে না। নির্ভরযোগ্য মুফতী সাহেবের কাছ থেকে হুকুম নিন; হিসাবের দিক থেকে যাকাতের তহবিল আলাদা ও স্পষ্ট রাখুন।
নিজস্ব আয়ের পরিকল্পনা কি পরিষদকে জানাতে হবে?
মাসিক প্রতিবেদনে নিজস্ব আয়ের খাত আছে, তাই আয় সেখানে দেখাতে হবে। বড় পরিকল্পনা নিলে পরিষদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
এই লেখা পরিষদের সম্পাদনা পরিষদের পক্ষ থেকে সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য। ফিকহী বা আইনগত বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
