মাদরাসার আয়-ব্যয়: উদ্বৃত্ত ও ঘাটতি বোঝা
৬ নভেম্বর ২০২৬ · ৬ মিনিটে পড়া · জমিরিয়া তা'লিম ও তায্কিয়া পরিষদ
মাদরাসায় উদ্বৃত্ত মানে হলো একটি সময়ে আয় ব্যয়ের চেয়ে বেশি হয়েছে, আর ঘাটতি মানে ব্যয় আয়ের চেয়ে বেশি। মাদরাসা ব্যবসা নয়, তাই এখানে "লাভ-ক্ষতি" শব্দের চেয়ে "উদ্বৃত্ত-ঘাটতি" শব্দ বেশি মানানসই। মূল উদ্দেশ্য মুনাফা নয়; স্থিতিশীলভাবে ছাত্রদের পড়ানো, শিক্ষকের বেতন দেওয়া এবং আমানতের হিসাব ঠিক রাখা। এই লেখায় সংখ্যাগুলো কীভাবে পড়তে হয়, তার সহজ নিয়ম বলা হলো।
উদ্বৃত্ত আর ঘাটতি আসলে কী?
মোট আয় থেকে মোট ব্যয় বাদ দিলে যা থাকে, সেটাই ফল। ধনাত্মক হলে উদ্বৃত্ত, ঋণাত্মক হলে ঘাটতি। যেমন কোনো মাসে আয় ব্যয়ের চেয়ে বেশি হলে বাকিটা মজুত হিসেবে থাকে; কম হলে অন্য উৎস থেকে মেটাতে হয়, বা বকেয়া জমে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ক নয়, সম্পর্কটাই মূল কথা। মাসিক প্রতিবেদনে আয়-ব্যয় লিখলে এই ফল সহজেই বেরিয়ে আসে; পড়ুন মাসিক প্রতিবেদন কীভাবে লিখবেন।
উদ্বৃত্ত হলেই কি সব ঠিক আছে?
না। উদ্বৃত্ত দেখে তিনটি প্রশ্ন করুন:
- এই আয় কি নিয়মিত, নাকি এক-দুই মাসের বিশেষ দান?
- যাকাত বা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে দেওয়া অর্থ কি অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য উদ্বৃত্ত দেখানো হচ্ছে?
- বেতন বা বিল বাকি রেখে কি উদ্বৃত্ত দেখানো হচ্ছে?
যাকাত বা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের অর্থ সাধারণ উদ্বৃত্ত নয়। কোন তহবিলের অর্থ কোথায় ব্যয় করা যায়, তার ফিকহী হুকুম নির্ভরযোগ্য মুফতী সাহেবের কাছ থেকে জেনে নিন। হিসাবের দিক থেকে তহবিল আলাদা রাখা জরুরি; পড়ুন চাঁদা, সদাকা ও যাকাতের তহবিল আলাদা রাখার নিয়ম।
ঘাটতি হলে কী বোঝায়?
ঘাটতি সব সময় খারাপ নয়, তবে চলতে থাকলে বিপদ। কারণ খুঁজে দেখুন:
- আয় কমেছে (দাতা কমেছে, ছাত্র কমেছে)?
- ব্যয় বেড়েছে (ভবন মেরামত, খোরাকির দাম, নতুন শিক্ষক)?
- এক-বারের বড় খরচ ছিল কি না?
- রসিদ বা হিসাবে ভুল বা অগোছালো কিছু আছে কি না?
কারণ বুঝে সমাধান করুন। এক-বারের খরচ হলে তা সামলানো সহজ; নিয়মিত ঘাটতি হলে কাঠামো ঠিক করা লাগে।
বেতনের অংশ কীভাবে দেখবেন?
মোট ব্যয়ের কত অংশ শিক্ষকদের বেতনে যাচ্ছে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বেতনের অংশ খুব কম হলে বুঝতে হবে শিক্ষকেরা সম্ভবত ন্যায্য বেতন পাচ্ছেন না। আবার খুব বেশি হলে অন্য খাতে (ভবন, কিতাব, খোরাকি) চাপ পড়তে পারে। কোনটি আদর্শ, তার নির্দিষ্ট শতাংশ এখানে বলা হয়নি; মাদরাসার আকার ও ধরন ভেদে আলাদা হয়। শিক্ষকদের ন্যায্য বেতন ও কাঠামো নিয়ে পড়ুন শিক্ষকদের বেতন কাঠামো ও ন্যায্য বেতন বৃদ্ধি।
নিজস্ব আয়ের অংশ কেন দেখা দরকার?
মোট আয়ের কত অংশ চাঁদা, সদাকা ও যাকাত, আর কত অংশ নিজস্ব উৎস (ছাত্র ফি, জমি বা দোকানের আয়, প্রকাশনা) থেকে আসছে, তা আলাদা করে দেখুন। নিজস্ব আয়ের অংশ বাড়লে মাদরাসা দাতা বা মৌসুমি দানের ওপর কম নির্ভর করে। এটি রাতারাতি হয় না; ছোট ছোট ধাপে এগোতে হয়। উপায় জানতে পড়ুন মাদরাসার টেকসই আয়ের উৎস।
ঘাটতি সামলাতে কী করা যায়?
ধাপে ধাপে এগোন:
- তিন-চার মাসের আয়-ব্যয় পাশাপাশি রেখে প্রবণতা দেখুন।
- অপ্রয়োজনীয় ও পিছিয়ে দেওয়া যায় এমন খরচ চিহ্নিত করুন, কিন্তু বেতন কাটার আগে শেষ বিকল্প ভাবুন।
- বছরের শুরুতে একটি বাজেট করুন এবং মাসে মাসে মিলিয়ে দেখুন।
- কমিটিতে খোলামেলা আলোচনা করুন এবং দাতাদের স্বচ্ছভাবে অবস্থা জানান।
- বড় ঘাটতি হলে পরিষদের কাছে পরামর্শ চান।
বাজেটের নিয়ম আছে বার্ষিক বাজেট ও পরিকল্পনা লেখায়।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে
এই বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের একটি করে নির্দেশনা দেখা যায়।
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيْنٍ إِلَىٰٓ أَجَلٍۢ مُّسَمًّۭى فَٱكْتُبُوهُ ۚ وَلْيَكْتُب بَّيْنَكُمْ كَاتِبٌۢ بِٱلْعَدْلِ ۚ وَلَا يَأْبَ كَاتِبٌ أَن يَكْتُبَ كَمَا عَلَّمَهُ ٱللَّهُ ۚ فَلْيَكْتُبْ وَلْيُمْلِلِ ٱلَّذِى عَلَيْهِ ٱلْحَقُّ وَلْيَتَّقِ ٱللَّهَ رَبَّهُۥ وَلَا يَبْخَسْ مِنْهُ شَيْـًۭٔا ۚ فَإِن كَانَ ٱلَّذِى عَلَيْهِ ٱلْحَقُّ سَفِيهًا أَوْ ضَعِيفًا أَوْ لَا يَسْتَطِيعُ أَن يُمِلَّ هُوَ فَلْيُمْلِلْ وَلِيُّهُۥ بِٱلْعَدْلِ ۚ وَٱسْتَشْهِدُوا۟ شَهِيدَيْنِ مِن رِّجَالِكُمْ ۖ فَإِن لَّمْ يَكُونَا رَجُلَيْنِ فَرَجُلٌۭ وَٱمْرَأَتَانِ مِمَّن تَرْضَوْنَ مِنَ ٱلشُّهَدَآءِ أَن تَضِلَّ إِحْدَىٰهُمَا فَتُذَكِّرَ إِحْدَىٰهُمَا ٱلْأُخْرَىٰ ۚ وَلَا يَأْبَ ٱلشُّهَدَآءُ إِذَا مَا دُعُوا۟ ۚ وَلَا تَسْـَٔمُوٓا۟ أَن تَكْتُبُوهُ صَغِيرًا أَوْ كَبِيرًا إِلَىٰٓ أَجَلِهِۦ ۚ ذَٰلِكُمْ أَقْسَطُ عِندَ ٱللَّهِ وَأَقْوَمُ لِلشَّهَٰدَةِ وَأَدْنَىٰٓ أَلَّا تَرْتَابُوٓا۟ ۖ إِلَّآ أَن تَكُونَ تِجَٰرَةً حَاضِرَةًۭ تُدِيرُونَهَا بَيْنَكُمْ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَلَّا تَكْتُبُوهَا ۗ وَأَشْهِدُوٓا۟ إِذَا تَبَايَعْتُمْ ۚ وَلَا يُضَآرَّ كَاتِبٌۭ وَلَا شَهِيدٌۭ ۚ وَإِن تَفْعَلُوا۟ فَإِنَّهُۥ فُسُوقٌۢ بِكُمْ ۗ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۖ وَيُعَلِّمُكُمُ ٱللَّهُ ۗ وَٱللَّهُ بِكُلِّ شَىْءٍ عَلِيمٌۭ
হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ঋনের আদান-প্রদান কর, তখন তা লিপিবদ্ধ করে নাও এবং তোমাদের মধ্যে কোন লেখক ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লিখে দেবে; লেখক লিখতে অস্বীকার করবে না। আল্লাহ তাকে যেমন শিক্ষা দিয়েছেন, তার উচিত তা লিখে দেয়া। এবং ঋন গ্রহীতা যেন লেখার বিষয় বলে দেয় এবং সে যেন স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্রও বেশ কম না করে। অতঃপর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দূর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বলে দিতে অক্ষম হয়, তবে তার অভিভাবক ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখাবে। দুজন সাক্ষী কর, তোমাদের পুরুষদের মধ্যে থেকে। যদি দুজন পুরুষ না হয়, তবে একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা। ঐ সাক্ষীদের মধ্য থেকে যাদেরকে তোমরা পছন্দ কর যাতে একজন যদি ভুলে যায়, তবে একজন অন্যজনকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যখন ডাকা হয়, তখন সাক্ষীদের অস্বীকার করা উচিত নয়। তোমরা এটা লিখতে অলসতা করোনা, তা ছোট হোক কিংবা বড়, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এ লিপিবদ্ধ করণ আল্লাহর কাছে সুবিচারকে অধিক কায়েম রাখে, সাক্ষ্যকে অধিক সুসংহত রাখে এবং তোমাদের সন্দেহে পতিত না হওয়ার পক্ষে অধিক উপযুক্ত। কিন্তু যদি কারবার নগদ হয়, পরস্পর হাতে হাতে আদান-প্রদান কর, তবে তা না লিখলে তোমাদের প্রতি কোন অভিযোগ নেই। তোমরা ক্রয়-বিক্রয়ের সময় সাক্ষী রাখ। কোন লেখক ও সাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করো না। যদি তোমরা এরূপ কর, তবে তা তোমাদের পক্ষে পাপের বিষয়। আল্লাহকে ভয় কর তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আল্লাহ সব কিছু জানেন।
সূরা বাকারা, আয়াত ২:২৮২লেনদেন লিখে রাখার এই নির্দেশ হিসাব-নিকাশের স্বচ্ছতার মূল ভিত্তি। আয়-ব্যয়ের খাতা, রসিদ ও ভাউচার রাখা এই শিক্ষারই বাস্তব রূপ।
عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَصْدُقُ وَيَتَحَرَّى الصِّدْقَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ صِدِّيقًا وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ كَذَّابًا
ভাবার্থ: তোমরা সত্যকে আঁকড়ে ধরো; সত্য নেকীর পথ দেখায়, আর নেকী জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।
সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬০৭সত্যবাদিতা হিসাবেও জরুরি। যা আয় হয়েছে ও যা ব্যয় হয়েছে তা যেমন তেমন লেখা এবং কোনো কিছু গোপন না করাই আমানতদারি।
সংক্ষেপে করণীয়
- প্রতি মাসে মোট আয় থেকে মোট ব্যয় বাদ দিয়ে উদ্বৃত্ত বা ঘাটতি বের করুন।
- উদ্বৃত্ত দেখলে নিশ্চিত হোন তা বকেয়া চেপে বা নির্দিষ্ট তহবিল মিলিয়ে দেখানো হচ্ছে না।
- ঘাটতি হলে কারণ খুঁজুন: আয় কমেছে, নাকি ব্যয় বেড়েছে।
- বেতন ও নিজস্ব আয়ের অংশ বছরে অন্তত একবার হিসাব করে দেখুন।
- বছরের শুরুতে বাজেট করে কমিটিতে অনুমোদন করান।
প্রশ্নোত্তর
মাদরাসার জন্য কি মুনাফা করা উচিত?
মাদরাসার উদ্দেশ্য মুনাফা নয়, দ্বীনী শিক্ষা ও সেবা। তবে টেকসইভাবে চলার জন্য স্বাভাবিক সময়ে ব্যয়ের চেয়ে কিছু আয়ের মজুত থাকা ভালো। নিজস্ব আয়ের উৎস বা তহবিলের শরয়ী বিষয়ে মুফতী সাহেবের পরামর্শ নিন।
যাকাতের টাকা বেতনে খরচ করা কি যায়?
এটি একটি ফিকহী প্রশ্ন, তাই নির্ভরযোগ্য মুফতী সাহেবের কাছ থেকে হুকুম জেনে নিন। হিসাবের দিক থেকে যাকাতের তহবিল আলাদা খাতায় রেখে যেখানে ব্যয় করা হয়েছে, তার স্পষ্ট রেকর্ড রাখুন।
প্রতি বছরই ঘাটতি হচ্ছে, কী করব?
এটি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত। আয়ের নিয়মিত উৎস বাড়ান, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমান, বাজেট মেনে চলুন এবং পরিষদের সাথে আলোচনা করুন।
উদ্বৃত্ত টাকা কীভাবে রাখব?
নিরাপদে, হিসাবসহ ও স্বচ্ছভাবে রাখুন। দীর্ঘমেয়াদি তহবিল বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শরীয়তসম্মত পথ কোনটি, তা মুফতী সাহেবের কাছে জানুন।
এই লেখা পরিষদের সম্পাদনা পরিষদের পক্ষ থেকে সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য। ফিকহী বা আইনগত বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
